অভিযোগ আছে, তারা বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালকদের নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। যারা সরকারি অ্যাম্বুলেন্স নষ্ট বলে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়ে বেশি ভাড়া আদায় করে থাকেন।
খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে থাকা বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের চালক মো. ইমরান হাসপাতাল থেকে এক রোগীকে সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা পৌঁছে দিতে ২ হাজার ২শ’ টাকা দাবি করেন। রোগীর অভিভাবক মোসলেম গাজী জানান, পাটকেলঘাটা থেকে এ হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্সে আসতে তার ১ হাজার ৫শ’ টাকা লেগেছিল। আরেক রোগীর স্বজন মো. নাজমুল হোসেন জানান, পাইকগাছা যাওয়ার জন্য এখানকার বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স তার কাছ থেকে ২ হাজার ৫শ’ থেকে ৩ হাজার টাকা দাবি করেছে। সরকারি হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স নষ্ট থাকায় বাধ্য হয়েই তাদের কাছ থেকে অ্যাম্বুলেন্স নিতে হয়েছে।
নগরীর আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালক মো. টিপু সোনাডাঙ্গার সার্জিক্যাল মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল থেকে শিরোমনি পর্যন্ত (১০ কি.মি.) ৭/৮শ’ টাকা দাবি করেন।
খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আনন্দ মোহন সাহা বলেন, নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের উড়ো অভিযোগ তিনি শুনেছেন। কিন্তু কেউ লিখিত অভিযোগ না দেওয়ায় দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের লাইন দেখা যায়। তাদের বিরুদ্ধে খুব শিগগির ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে র্যা ব-পুলিশের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আর দালালদের সহজে চিহ্নিত করার জন্য হাসপাতালের চতুর্থ ও তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারিদের আইডি কার্ড দেওয়া হবে।
খুলনা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, খুলনা বিভাগের ১০৬টি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে ৪২টি বা ৪০ শতাংশই অচল। বাকি ৬৪টি সচল থাকলেও তা সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় না। এর মধ্যে খুলনায় ১১টি, বাগেরহাটে ৮টি, সাতক্ষীরায় ৯টি, যশোরে ৭টি, ঝিনাইদহ ৭টি, নড়াইলে ৪টি, মাগুরায় ৩টি, কুষ্টিয়ায় ৭টি, চুয়াডাঙ্গা ৪টি এবং মেহেরপুরে ৪টি সচল রয়েছে।
তবে বাগেরহাটের মোল্লাহাট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ২টি, মাগুরার শালিখা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটি এবং চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কোনও অ্যাম্বুলেন্স সচল নেই। ফলে সংকটময় মুহুর্তে রোগী আনা নেওয়া করতে ব্যয় বাড়ছে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (ট্রাফিক) মো. রাকিব হাসান বলেন, যারা বিআরটিএ অনুমোদন ছাড়া যত্রতত্র বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালু রেখেছেন তাদের বিরুদ্ধে খুব শিগগিরই অভিযান চালানো হবে। তাদেরকে আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।
জানা গেছে, খুলনা সরকারি হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস এখন অসাধু সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে অ্যাম্বুলেন্স সংকটের সুযোগ নিয়ে রোগীদের জিম্মি করছে এ সিন্ডিকেট। নূন্যতম সুযোগ-সুবিধা নেই এমন পুরনো লক্কর-ঝক্কর মাইক্রোবাস গ্যারেজে মেরামত করে হর্ন লাগিয়ে ও গায়ে ‘অ্যাম্বুলেন্স’-এরস্টিকার মেরে অ্যাম্বুলেন্সে রূপান্তর করা হচ্ছে। লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স সঙ্কটের সুযোগ নিয়ে এ কার্যক্রম চলছে।
খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনে রাস্তার দু’ধার ঘেঁষে সারিবদ্ধভাবে ১০-১৫টি অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে থাকে। হাসপাতাল থেকে বের হওয়া রোগীর স্বজনরা এই বাহনগুলোর কাছে আসার আগেই দালাল চক্র ঘিরে ধরে এবং কম টাকায় নিরাপদে পৌঁছানোর কথা বলে। এখানে দালালদের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের দর কষাকষি ও ঝগড়া নিত্যদিনের ঘটনা।
খুলনা জেলা অ্যাম্বুলেন্স চালক কল্যাণ সমবায় সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. আমির হোসেন জানান, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করার প্রশ্নই আসে না। আমরা সব সময় ভাড়া কম নেই।
তিনি আরও বলেন, সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগীদের প্রয়োজনে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। কিন্তু ভাড়া ওরাই ঠিক করে। আমরা চুক্তি অনুযায়ী ভাড়া নেই। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে রোগী যাতায়াত খরচ কম। তাদের পথ খরচও কম। শুধু একবার টোল ভাড়া দেওয়া লাগে। আমাদের আসা-যাওয়ায় টোল দিতেই হয়। মাঝে মধ্যে প্রশাসনকেও চাঁদা দেওয়া লাগে। তার সমিতির আওতায় খুলনায় ৬০-৭০টি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স আছে। অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ন্ত্রণে সমিতির পক্ষ থেকে ভাড়া নির্ধারণের চার্ট করে দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আনন্দ মোহন সাহা বলেন, এ হাসপাতালের দুটি অ্যাম্বুলেন্সের একটি সচল আছে। আর একটি খুঁড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে।
বাগেরহাটের মোল্লাহাট স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সৈয়দ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ৭ বছর ধরে একটি অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে কাজ চলছে। বর্তমানে রোগীদের আনা নেওয়ার জন্য বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সই ভরসা। নতুন অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও কোনও সুফল পাওয়া যায়নি। তবে শিগগিরই নতুন অ্যাম্বুলেন্স পাওয়ার সম্ভাবনা কথা জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
কয়রা উপজেলা চেয়ারম্যান আ খ ম তমিজ উদ্দিন বলেন, কয়রা প্রত্যন্ত অঞ্চল হওয়ায় এখানে একটি মাত্র অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে রোগীদের সেবা দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছে। দিন দিন রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় এখানে আরও একটি অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজন।
/এসএনএইচ/টিএন/আপ-এমও