খুলনার সরকারি ল্যাবরেটরি হাই স্কুলটির জরাজীর্ণ ভবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। ১৯৬৭ সালে নির্মিত একাডেমিক ভবন ও হোস্টেল চলছে জোড়াতালি দিয়ে। প্রধান শিক্ষকের বাসভবনটি ছাদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। মাথার ওপর ভাঙ্গা ছাদ, পলেস্তরা খসে পড়া দেয়ালের কক্ষে ক্লাস করছেন শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, আসবাবপত্র ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি সংকট এবং শিক্ষক স্বল্পতায় শিক্ষা কার্যক্রম চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক সন্তোষ কুমার ঢালী বলেন, বিদ্যালয়ের অবকাঠামোর অবস্থা খুবই নাজুক। প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দফতরে একাধিকবার চিঠিপত্র দিয়েও দৃশ্যমান প্রতিকার হচ্ছে না। বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণসহ অন্যান্য কাজের জন্য সাড়ে চার কোটি টাকার একটি সুপারিশ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের কর্মকর্তারা ২০১৪ সালে মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেছিল। কিন্তু সে ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনও অগ্রগতি হয়নি।
উল্লেখ্য, খুলনা শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরত্বে ফুলবাড়ীগেট তেলিগাতী এলাকায় ১৯৬৭ সালে ৪ দশমিক ৪৪ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় সরকারি ল্যাবরেটরি হাই স্কুল। সে সময় নির্মিত দ্বিতল বিশিষ্ট একটি একাডেমিক ভবন ও ছাত্রাবাস অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। যা এখন ব্যবহারের অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে। প্রধান শিক্ষকের বাসভবনটি ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। ৪৯ বছর আগে নির্মিত ভবনগুলো জোড়াতালি দিয়ে ব্যবহার চলছে। তিনি জানান, বিদ্যালয়টি পাবলিক পরীক্ষা, খেলাধূলা, বিজ্ঞান মেলাসহ সকল প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানে কৃর্তিত্বের সাথে সুনাম অক্ষুণ্ন রেখেছে। বর্তমানে স্কুলটিতে ১১৮৩ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। নানা সমস্যা এবং প্রতিকুলতার মধ্যে তারা শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, স্কুলটির একাডেমিক ভবনের কলাম এবং বিমগুলো ভেঙে রড বেরিয়ে গেছে। ছাদের ঢালাই ভেঙ্গে রড ঝুলে পড়েছে। রডগুলোর কার্যকারিতা শেষ হয়েছে। অধিকাংশ ক্লাসরুমের জানালা এবং দরজা ভাঙা। রুমের পলেস্তরা খসে ইট বের হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে ছাদের পলেস্তরা এবং ঢালাই ভেঙে পড়ছে। একই অবস্থা বিরাজ করছে একমাত্র ছাত্রাবাসেও।
বিদ্যালয়সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক শুধুমাত্র প্রধান শিক্ষকের বাসভবনটি কন্ডেম (অকেজো) ঘোষণা করার পর ভবনটি জরুরি ভিত্তিতে অপসারণ করতে কার্যকর ব্যবস্থা জন্য প্রধান শিক্ষককে নির্দেশ প্রদান করা হয়। স্কুল কর্তৃপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর খুলনার সহকারী শেখ নাসিম রেজা এবং উপ-সহকারী মো. সিদ্দুকুর রহমান স্কুলটি পরিদর্শন করে ২০১৪ সালের ১৯ মে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকার সুপারিশ করে। এর মধ্যে ছিল একাডেমিক ভবনের জন্য ২ কোটি টাকা, প্রশাসনিক ভবন কাম একাডেমিক ভবন মেরামতের জন্য ৩০ লাখ টাকা, অডিটরিয়াম ভবন নির্মাণের জন্য ২ কোটি চাকা, স্কুলের আসবাবপত্রের জন্য ১০ লাখ টাকা, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির জন্য ৫ লাখ টাকা, খেলাধূলার সামগ্রীর জন্য ৫ লাখ টাকা। কিন্তু স্কুলটিকে বরাদ্ধ দেওয়া হয় মাত্র পাঁচ লাখ টাকা। যা বর্ষার মৌসুমে নিমজ্জিত থাকা রাস্তা এবং ভবনের কিছু অংশের মেরামতে ব্যয় হয়েছে।
সূত্র জানান, বিধি অনুযায়ী স্কুলে শিক্ষক সংকট প্রকট। সহকারী প্রধান শিক্ষককের পদ শূন্য। তথ্যপ্রযুক্তি বিষয় থাকলেও কোনও শিক্ষক নেই। এছাড়া হিন্দু ধর্ম, চারুকলা, অর্থনীতি, পৌরনীতি, ক্যারিয়ার বিষয় থাকলেও শিক্ষকদের পদ ও শিক্ষক নেই। পাশাপাশি ভূগোল এবং চারুকলা কোনও শিক্ষক নেই। বিধি অনুযায়ী বিষয়ভিত্তিক বাংলায় ২ জন্য এবং গণিতে ২ জন শিক্ষক স্বল্পতা রয়েছে। এনালগ একটি লাইব্রেরি আছে, কিন্তু লাইব্রেরিয়ানের কোনও পদ নেই, নেই লাইব্রেরীয়ানও। নিরাপত্তা প্রহরীর পদ থাকলেও পদটি শুন্য। পরিবহনের কোন ব্যবস্থা নেই। ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাব ও ল্যাবরেটরিও স্থাপিত হয়নি। বিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস সুরক্ষার পুরনো প্রাচীরটি নষ্ঠ হয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত টয়লেটও নেই। বর্ষা মৌসুমে স্কুলটির ক্যাম্পাসে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা খুলনার পরিচালক টি এম জাকির হোসেন বলেন, বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় মেরামত কাজ জরুরি ভিত্তিতে শুরু করার জন্য শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরকে ব্যাবস্থা নিতে বলবেন। ঝুঁকিপূর্ণ একাডেমিক ভবনের বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে আলোচনা করে ভবনগুলো সার্ভে করে কন্ডেম ঘোষণা ও নতুন ভবন নির্মাণের জন্য প্রকল্প প্রস্তুত করা হবে।
/এইচকে/