সাতক্ষীরা জেলার অধিকাংশ এলাকায় বছরের বেশিরভাগ সময় জলাবদ্ধ থাকে। বোরো ধানের আবাদই অনেক কৃষকের একমাত্র চাষ। এপ্রিলে ধান পাকতে শুরু করেছে। কৃষকরা অনেক আশা করেছিলেন, এবার বোরো আবাদে বাম্পার ফলন পাবেন। তবে সপ্তাহ খানেক আগে থেকেই ব্লাস্ট নামক ছত্রাকের আক্রমণে ধানের শীষ শুকিয়ে যাওয়ায় এখন কৃষকদের মাথায় হাত।
যে কৃষকের নিজস্ব জমি আছে, তার বিঘা প্রতি খরচ হয়েছে থেকে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। আর অন্যের জমি যারা লিজ নিয়ে বোরো ধান চাষ করছেন তার বিঘা প্রতি ৮ হাজার টাকা করে খরচ হয়েছে। অনেকে বাড়ির গরু-ছাগল বিক্রি করে, আবার অনেকে গাছ-গাছালি বিক্রি করে, অনেকে আবার বিভিন্ন সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে বোরো আবাদ করেছেন। ফসল সংগ্রহের এই সময় ব্লাস্ট রোগের আক্রমণে এখন কৃষকরা খরচ উঠাতেই হিমশিম খাচ্ছে।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলায় প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬৫০ হেক্টর বেশি। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে দুই লক্ষ ৯৭ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে তালা উপজেলায় ৩৬ হেক্টর, আশাশুনিতে ৩০, কলারোয়া ৬ হেক্টর ও অন্যান্য উপজেলা অল্প কিছু জমিতে এই ছত্রাকের আক্রমণ দেখা দিয়েছে।
কলারোয়া উপজেলার দেয়াড়া ইউনিয়নের পাকুড়িয়া গ্রামের নূর হোসেন বোরো চাষ করেছেন চার বিঘা জমিতে। বিঘা প্রতি ৮ হাজার টাকা করে লিজের টাকা দিতে হয়েছে তাকে। জমি চাষ, বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকদের মুজুরি বাবদ খরচ করেছেন বিঘা প্রতি ৫ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে ৫২ হাজার টাকা খরচ হলেও ১০ হাজার টাকার ধান পাবেন না বলে আশঙ্কা করছেন।
তিনি জানান, তিন সপ্তাহ আগে যশোরের মনিরামপুরে বোরো ক্ষেতে ব্লাস্ট ছত্রাকের আক্রমণ দেখা দেয়। তার পর দেখা দেয় সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলায়। এ খবর তার কাছে পৌঁছানোর এক দিন যেতে না যেতেই তার ক্ষেতেও ব্লাস্ট রোগ দেখা দেয়। এতে ধানের শীষগুলো দিনে পর দিন শুকিয়ে যাচ্ছে। কৃষি বিভাগের কোনও পরামর্শই তাদের কাজে লাগছে না বলে দাবি করেন তিনি।
একইভাবে কলারোয়া উপজেলার দেয়াড়া গ্রামের আইয়ুব হোসেন, ঘলঘলিয়া গ্রামের সাহেব আলীসহ কয়েকজন জানান, ধান লাগানোর কিছুদিন পর পাতায় এক ধরনের চোখ দেখা দেয়। চোখের পাশে কয়েকটি সাদা দাগও তারা লক্ষ্য করেন। এটাকে পাতা ব্লাস্ট বলা হয়। কয়েকদিন যেতে না যেতেই ধানের ফুল আসার সঙ্গে সঙ্গে শীষের নিচের গিট শুকিয়ে যেতে দেখেছেন। এটাকে ধানের নেক ব্লাস্ট বলা হয়। তবে পাতা ব্লাস্ট ও নেক ব্লাস্টের খুব বেশি প্রভাব পড়েনি তাদের এলাকায়। তবে দুই সপ্তাহ আগে থেকে গিট ব্লাস্ট (ধানের শীষ শুকিয়ে সাদা হয়ে যাওয়া) রোগ যেভাবে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে তাতে শুধু দেয়াড়া ইউনিয়ন নয়, পাশের ইউনিয়নগুলোতেও এর প্রভাব পড়েছে। ছত্রাকনাশক নাটিবো, টাটাবো ও টু-ওভার স্প্রে করেও মাঠের পর মাঠ সাদা হয়ে যাচ্ছে।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ কাজী আব্দুল মান্নান জানান, বর্তমানে ধানে দানা বাঁধা শুরু হয়েছে। কিছু কিছু ধান পেকে যাওয়ায় কাটা শুরু হয়েছে। বর্তমানে কিছু কিছু এলাকায় ব্লাস্ট রোগ দেখা দিয়েছে। এটি একটি ছত্রাক জনিত রোগ। কৃষকদের ছত্রাকনাশক স্প্রে, জমিতে পানি ধরে রাখা ও জমিতে ইউরিয়া ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে কৃষকদের মাঝে লিফলেটও বিতরণ করা হয়েছে। যদি কৃষকরা এ সব অনুসরণ করেন তাহলে উৎপাদনে খুব একটা অসুবিধা হবে না বলে তিনি আশাবাদ ব্যাক্ত করেন।
/এআর/