বাগেরহাট বাজারে বাবার সঙ্গে তরকারির ব্যবস্যা করতেন আতিয়ার রহমান। রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শুনে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে উৎসাহী হন। পরে কাউকে কিছু না জনিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন আতিয়ার। সেনা সদস্য বজলুর রহমানের সঙ্গে তিনি সাবেক সংসদ সদস্য রহমান সাহেবের বাহিনীতে যোগ দেন।
আতিয়ার সরদার বলেন, ‘জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। আর এখন পুটিমারী নদীর পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে আছি। কিন্তু যারা স্বাধীনতার সময় রাজাকার ছিল, টাকার জোরে তাদের অনেকে আজ মুক্তিযোদ্ধা। আবার দেশের সবরমক সুযোগ-সুবিধাও নিচ্ছে তারা। মাঝে মাঝে মনে হয় আবারও এদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে যুদ্ধ করি।’
৭১-এ যুদ্ধের কথা স্মরণ করতে গিয়ে আতিয়ার সরদার বলেন, ‘আগে থেকে আনসারের ট্রেনিং থাকায় অস্ত্র চালনায় পারদর্শী ছিলাম। বাহিনীর অন্য সদস্যদের সঙ্গে খুলনার গল্লামারী যুদ্ধে অংশ নেই। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের মুখে টিকে থাকতে না পেরে আমরা পিছু হটি। পরে বাগেরহাট এসে বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্প করে অবস্থান নেই। কিন্তু রাজাকার বাহিনীর সামনে টিকতে না পেরে ৬/৭ জনের একটি দল বেঁধে পিরোজপুরে পাড়ি জমাই। উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযোদ্ধা বাহিনীর কমান্ডার মেজর জিয়ার বাহিনীতে যোগ দেওয়ার। কিন্তু রাতের অন্ধকারে ভুলক্রমে আমরা পিরোজপুর টাউন স্কুল মাঠে নকশাল বাহিনীর নেতা রাজের ক্যাম্পে গিয়ে উঠি। সেখানে আমাদের আটক করা হয়। ছিনিয়ে নেওয়া হয় আগ্নেয়াস্ত্র। সিদ্ধান্ত হয় পরের দিন আমাদেরকে মেরে ফেলা হবে।’
আতিয়ার আরও বলেন, আমি তখন কিভাবে বাঁচা যায় চিন্তা করছিলাম। পরে রাতে বাথরুমে যাওয়ার কথা বললে তারা রাজি হচ্ছিল না। পরে নকশাল বাহিনীর দুইজন সদস্যের পাহারায় খালপাড়ে একটি বাথরুমে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে আধাপাকা একটি বাথরুমের ওপরের স্লাভ ফেলে দিয়ে পাইপের মধ্যথেকে নদীতে নেমে সাঁতরিয়ে গভীর রাতে গিয়ে মেজর জিয়ার মুক্তিযোদ্ধা ক্যম্পে উঠি। তখন মেজর জিয়া ওই ক্যম্পে ছিলেন না। তার সহযোদ্ধা আবুল কালাম বিষয়টি শুনে ওই নকশাল ক্যাম্পে অভিযান চালিয়ে অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্ধার করা হয়। এরপর আবার বাগেরহাট চলে আসি।’
মুক্তিযোদ্ধা আতিয়ার বলেন, ‘এরপর সাবেক এমপি রহমানের নেতৃত্বে ৪৫৩ জনের দলের সঙ্গে ভারতে পাড়ি জমাই। ভারতের বোনগা এলাকার লিছু তলা ক্যাম্পে গিয়ে উঠি। পরে ভারতীয় সেনারা আমাদের বিরভুম চাকুলিয়া সাতচুড়া ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশে এসে চুকনগর কেশবপুর এলকায় যুদ্ধ করি। এরপর বাগেরহাটের বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করি। দেশ স্বাধীন হলে আবার বাবার সঙ্গে ব্যবসায় ফিরি।’
দেশ স্বাধীনের পর ভালোই চলছিল মুক্তিযোদ্ধা আতিয়ারের সংসার কিন্তু ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যার পর এদেশে থাকা তার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রাণ বাঁচাতে তিনি ভারতে পাড়ি জমান। ভারতের পায়রা ডাঙ্গা এলাকায় গিয়ে নিজেকে শ্যামল সরদার পরিচয় দিয়ে কলিকাতার পায়রা ডাঙ্গা এলাকায় এক গ্রাম পঞ্চায়েতের আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বসবাস করতেন। আতিয়ার সরদার তিন মেয়ে ও এক ছেলের জনক।
আতিয়ার সরদার বলেন, ‘১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে পরিবার নিয়ে বাংলাদেশে চলে আসি। কিন্তু বাবার রেখে যাওয়া মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশ জমি ৯ ভাই বোনের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে যায়। পরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সহায়তায় রণবিজয়পুর কুয়েত পল্লীতে ( গুচ্ছগ্রাম) বসবাস শুরু করি। ২০০১ সালে পুনরায় বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতা গ্রহণ করলে আমার ওপর চালানো হয় নির্যাতন। নিরুপায় হয়ে আবারও ভারতে চলে যাই।’
তিনি বলেন, ‘২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে আবার দেশে ফিরে আসি। পরে জেলা প্রশাসনের সহায়তায় সদর উপজেলার গোবরদিয়া এলাকায় পুটিমারী নদীর পাড়ে সরকারি খাস জমি আমার নামে বরাদ্দ পাই। সেই থেকে একটি কুঁড়েঘর বেধে সেখানে বসবাস করছি। তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। একমাত্র ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে এখানে বসবাস করছি। একাধিকবার আমার জন্য সরকারি ঘর বরাদ্দের তালিকা করা হলেও আজও একটি ঘর পাইনি।’