ওয়াসার পানি সরবরাহে স্থাপিত পাইপলাইন পরীক্ষা না করেই রাস্তা কার্পেটিং

 

খুলনাখুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় নগর জুড়ে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন শেষ হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী কাজ শেষে পাইপলাইন নেটওয়ার্ক উপযুক্তভাবে কাজ করবে কিনা তা পরীক্ষা করে ওয়াসা কর্তৃপক্ষের বুঝে নেওয়ার কথা। কিন্তু নগরীর একটি স্থানে পরীক্ষা করার পর ফলাফল ইতিবাচক হয়নি। কিন্তু এরপর আর কোথাও পরীক্ষা না করেই সমস্ত নেটওয়ার্ক কার্পেটিং করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন এ নেটওয়ার্ক দিয়ে সঠিকভাবে পানি সরবরাহ করা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাইপলাইন দিয়ে নোংরা ও দূষিত পানি আসার সম্ভাবনাও প্রবল।

ওয়াসার ডিএমডি ও পানি সরবরাহ প্রকল্পের পরিচালক এম কামাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘পাইপলাইন নেটওয়ার্ক টেস্ট করার কাজ করেই ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বিঘ্নভাবে পানি সরবরাহ শুরু করা হবে। বর্তমানে প্রকল্পের আওতায় অন্তত ৪৫ হাজার পরিবারকে বিনামূল্যে পানির সংযোগ দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে ৫ হাজার বাড়িতে সংযোগ দেওয়ার কাজ সম্পন্ন হয়েছে।’

খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের মাধ্যমে খুলনা শহর থেকে ৭১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মধুমতি নদী থেকে পানি সংগ্রহের পর তা পরিশোধনের মাধ্যমে খুলনা সিটি করপোরেশন এলাকায় সরবরাহ করা হবে। মধুমতি নদী থেকে পাইপের মাধ্যমে অপরিশোধিত এ পানি খুলনা শহর সংলগ্ন রূপসা উপজেলার পাথরঘাটা এলাকায় পরিশোধন করা হবে। সেখানে দৈনিক গড়ে ১ লাখ ১০ হাজার ঘনলিটার পানি পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি প্লান্টের পাশাপাশি ৭ লাখ ৭৫ হাজার কিউবিক মিটার অপরিশোধিত পানি সংরক্ষণের জন্য ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন একটি জলাধার নির্মাণ করা হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে এক থেকে দুই সপ্তাহ মধুমতির পানি কিছুটা লবণাক্ত হয়ে পড়ে। সে সময় জলাধারের পানি পরিশোধন করে প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ করা হবে।

‘ক্লিয়ার ওয়াটার ট্রান্সমিশন মেইনস ইনক্লুডিং রিভার ক্রসিংয়ের মাধ্যমে রূপসার পানি শোধনাগার থেকে রূপসা নদীর তলদেশ হয়ে খুলনা শহরের বিভিন্ন স্থানে ৭টি আন্ডারগ্রাউন্ড রিজার্ভার পর্যন্ত প্রায় ৪০ কিলোমিটার পাইপলাইন বসানো হয়েছে। এ সব লাইনে ৩০০ মি. মি. থেকে ১ হাজা ২০০ মি. মি. ব্যাসের ৩৩ কি.মি. ডাকটাইল আয়রন পাইপ ও মাঠ পর্যায়ে পাইপ বসানোর কাজ চলছে। এ পর্যন্ত ২৬ কিলোমিটার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া ‘ডিস্ট্রিবিউশন পাইপ নেটওয়ার্ক’র মাধ্যমে পাইপ লেয়িং’ কাজ হচ্ছে। এ কাজের আওতায় সিটি করপোরেশন এলাকায় বিভিন্ন ব্যাসের প্রায় ৬৫০ কিলোমিটারের মধ্যে ৬৩৫ কিলোমিটার পাইপলাইন বসানো শেষ হয়েছে। যার মাধ্যমে সব গ্রাহককের সুপেয় পানি সরবরাহ করা হবে।

খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্পের ডেভেলপমেন্ট প্রোজেক্ট প্রোপোজালে (ডিপিপি) দেখা যায়, মহানগরীতে এ জন্য ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সরবরাহ পাইপলাইন নেটওয়ার্ক স্থাপন কাজ চলছে। নেটওয়ার্কের পাইপের ব্যাস হবে ৫০ মিলিমিটার থেকে ৪০০ মিলিমিটার। এ পাইপলাইন নেটওয়ার্ক থেকে ৯০ হাজার গৃহে নতুন সংযোগ দেওয়া হবে। কাজের ঠিকাদার চায়না জিও নামের চীনের একটি প্রতিষ্ঠান ২০১৬ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে পাইপলাইন নেটওয়ার্ক স্থাপনের কাজ শুরু করে। সম্প্রতি নগরীর অভ্যন্তরে পাইপলাইন নেটওয়ার্ক স্থাপন সম্পন্ন হওয়ার পর এখন গৃহে সংযোগ লাইন দেওয়ার কাজ চলছে। মোল্লাহাট থেকে পাইপলাইন টানার কাজ ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে বলে ওয়াসার প্রকৌশলীরা জানান। রূপসা নদীর তলদেশ দিয়ে পাইপ বসানোর জটিল কাজ বাকি রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঠিকাদার চায়না জিও মহানগরীতে বড় ব্যাসের পাইপ রাস্তা খুঁড়ে স্থাপন করে। আর ছোট ব্যাসের পাইপ ১০০ ফুট দূরে দূরে গর্ত খুঁড়ে মাটির নিচে দিয়ে যন্ত্রের সাহায্যে টেনে নিয়ে জোড়া দেয়। দেখা গেছে যেদিন পাইপ বসানো হয় সেদিনই গর্তগুলো মাটি দিয়ে ভরাট করে দেওয়া হয়। জোড়াগুলো সঠিক বা লিকপ্রুফ হয়েছে কিনা তা টেস্ট করতে দেখা যায়নি কোথাও। এ প্রকল্পের বিডিং ডকুমেন্টের ১১ নম্বর ক্লজে বলা হয়েছে, সম্পূর্ণ পাইপলাইনের প্রত্যেক সেকশন পরীক্ষা করতে হবে। কোথাও কোনও ত্রুটি থাকলে ঠিকাদার তা মেরামত করবে। ঠিকাদার পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় জনশক্তি, সামগ্রী ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ করবে। এছাড়া টেন্ডার ডকুমেন্টে প্লাস্টিক এবং স্টিলের পাইপ স্থাপনের পর সেগুলোকে উপযুক্ত আবরণ দিয়ে এবং প্রয়োজনমতো বালি দিয়ে সংরক্ষিত করার শর্ত উল্লেখ করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খুলনা ওয়াসার কয়েকটি সূত্র জানায়, স্থাপিত পাইপলাইনে আবরণ দেওয়া এবং ভরাটের আগে বালি প্রয়োজনমতো দেওয়া হয়নি। বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সামনে থেকে বয়রা কলেজ সেকশনে সরবরাহ লাইন টেস্ট করা হয়। এ টেস্টে ফলাফল ইতিবাচক পাওয়া যায়নি। এখানে লাইনে ত্রুটি থাকার ফলে মীরেরডাঙ্গা পর্যন্ত সুষ্ঠু পানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটবে। এ অবস্থাতেই সেখানে মাটি চাপা দিয়ে রাস্তা কার্পেটিং করে দেওয়া হয়েছে। এরপর আর কোথাও টেস্ট করা হয়নি। কিন্তু রাস্তা কার্পেটিং করা হয়েছে। পাইপলাইন টেস্ট না করে কাজ শেষ করার ফলে দুটি অসুবিধা দেখা দেবে। প্রধান অসুবিধা হবে পানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন হবে না। দ্বিতীয়ত, সংযোগ স্থলগুলোতে লিক থাকতে পারে। সেখান দিয়ে পাইপলাইনে নোংরা এবং দূষিত পানি ঢুকতে থাকবে। এ পানি ব্যবহার মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যে বিপজ্জনক হবে।
প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘পাইপলাইন নেটওয়ার্কের কয়েক স্থানে পরীক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু ফলাফল ভালো হয়নি। তবে রাস্তাগুলোতে ব্যাপক খোঁড়াখুড়ি করা হয়েছে। বর্ষা আসার আগেই কার্পেটিং না করলে নগরবাসীর সমস্যা হবে। তাই দ্রুত সব রাস্তা কার্পেটিং করা হচ্ছে।’

ওয়াসার ডিএমডি ও পানি সরবরাহ প্রকল্পের পরিচালক এম কামাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘মধুমতি থেকে পাইপলাইন বসানোর ৮০ শতাংশ কাজ হয়েছে। রূপসা নদীর বেডের ১৫ মিটার নিচে দিয়ে পাইপলাইন আসবে। পাইপ বসানোর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এসে গেছে। আগামী জুন নাগাদ এ নেটওয়ার্ক দিয়ে পানি সরবরাহ শুরু করতে পারবো।’