২০১৭-২০১৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত অনন্ত ২১ শিক্ষার্থী খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) পিটুনি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানা গেছে। শিক্ষক ও অভিভাবকদের পরামর্শে ‘ঝামেলায় না জড়াতে’ ভুক্তভোগীরা ঘটনায় চেপে যান। বুয়েটে আবরার ফাহাদ হত্যার পর এসব বিষয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন ভুক্তভোগীরা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ থেকে জানা গেছে, কুয়েটের ফজলুল হক হল, খান জাহান আলী হল, ড. এম এ রশীদ হল, লালন শাহ হল, রোকেয়া হল (ছাত্রী), অমর একুশে হল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রায় আড়াই হাজার সিট নিয়ন্ত্রণ করে থাকে সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ নেতারা। মাদক সেবন, খাবারের মান ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে নিয়ন্ত্রকদের দ্বারা নির্যাতন ও গণধোলাই দিয়ে পুলিশে দেওয়া হতো।
চলতি বছরের ২৪ মার্চ রাতে কুয়েটের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ ও বিভিন্ন হল থেকে তিন ছাত্রকে মারধরের পর পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। ওই ঘটনায় ভুক্তভোগী ছিলেন মাহাদী হাসান, রেজাউল ও শাহীন। তারা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (আইইএম)বিভাগের ২০১৪ ব্যাচের শিক্ষার্থী। পরদিন পুলিশ তাদের খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে ভর্তি করে। ওই তিন ছাত্রকে বহিষ্কারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছিল।
মাহাদী হাসান বলেন, তারা তিন জন কোনও রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত নয়। ক্যাম্পাসে মাদক, জুনিয়রদের র্যাগিং ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিলেন, তাই রোষানলে পড়তে হয় তাদের।
এছাড়া ২০১৮ সালের ২৯ জানুয়ারি কুয়েটের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান হল থেকে মোয়াজ্জেম হোসেন ওরফে আল-আমিন, মাহাদী হাসান, পারভেজ ও নাজমুল কবীরকে মারধরের পর নাশকতার পরিকল্পনা করার অভিযোগসহ পুলিশে দেওয়া হয়। একইসঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে খানজাহান আলী থানায় দু’টি মামলাও করা হয়। ২০১৭ সালের ১ মে রাতে কুয়েটের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান হলে শিবির সন্দেহে ১৪ শিক্ষার্থীকে আটক ও বেধড়ক মারধর করা হয়। এরা হলেন আবদুল্লাহ নাইম, রুম্মান বিন জাহিদ, শহিদুল ইসলাম, রেজাউল্লাহ, মনিউল আলিফিন, আব্দুল আলিম, আব্দুল্লাহ আরমান, নাসির উদ্দিন, মোজাহের উদ্দিন, আবদুল্লাহ আরাফাত, লুৎফর রহমান, মাহিদি হাসান, শাহিনুজ্জামান ও মইন ইসলাম। ফুলতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ২ মে সকালে তাদের পুলিশে সোপর্দ করা হয়। নাশকতার পরিকল্পনা করছিল এমন অভিযোগে একটি মামলায় তাদের গ্রেফতার দেখানো হয়েছিল।
কুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতি শোভন হাসান বলেন, ‘ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ ছাড়া কোনও সংগঠনেরই দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই। সাতটি হলের কোনোটিতে ছাত্রলীগের কমিটি নেই। খুব দ্রুত কুয়েট ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মেয়াদে দুটি ঘটনা ঘটেছে। যার সঙ্গে নির্যাতনের কোনও সম্পর্ক নাই।’
কুয়েট ভিসি প্রফেসর ড. কাজী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, অতীতের যেকোনও সময়ের চেয়ে হলগুলোর পরিবেশ এখন অনেক ভালো।
সরকারি বিএল কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হেদায়েতুল্লাহ দিপুর অভিযোগ, কলেজের সুবোধ চন্দ্র হল, নজরুল হল, ড. জোহা হল এবং শহীদ তিতুমীর হল থেকে ২০১৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাতে ছাত্রদলের কর্মীদের মেরে বের করে দেওয়া হয়। ক্যাম্পাসে সন্ধ্যার পর মাদকের আড্ডা হয়।
বিএল কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি রিয়াজ শাহেদ বলেন, ‘কলেজে ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য কোনও ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের মিছিল-মিটিং হয় না। কথা বলারও অধিকার নেই।’
বিএল কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নিশাত ফেরদৌস অনি বলেন, স্থানীয় প্রভাবশালীরা হলে এসে মাদক সেবন করে। এই বিষয়গুলো প্রশাসনকে জানানো হলে তারাই ব্যবস্থা নেন। গত নির্বাচনের পর ছাত্রদলের নেতারা ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন। আর ফিরে আসেনি।
খুলনা মেডিক্যাল কলেজে (খুমেক) ২০১২ সালে এক ছাত্রকে হলের ভেতর উইকেট দিয়ে মারধর করা হয়েছিল।
খুমেক ছাত্রলীগের সভাপতি ডা. আসানুর ইসলাম বলেন, ‘এ ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ এবং ইচিপ (ইন্টার্নি চিকিৎসক পরিষদ) এর কার্যক্রম আছে। সব হলগুলোতে আমাদের আদর্শের ছাত্ররা থাকেন।’
খুলনার আযম খান সরকারি কমার্স কলেজে যারা নিয়মিত মিটিং-মিছিলে অংশ নেয় তাদেরকেই একমাত্র হলে আসন দেওয়া হয়। খুলনা সরকারি মহিলা কলেজের তিনটি আবাসিক ছাত্রী হলেও র্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটে।
সরকারি মুহসিন কলেজ চত্বরে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর দুপুরে অর্থনীতি বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র আলমগীর হোসেনকে মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। ছাত্রলীগ নেতা রওশন আনিজি অন্তু ও সাজ্জাদের দাবি, ওই আলমগীর শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
খুলনা মহানগরীর খানজাহান আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, কুয়েট থেকে বিভিন্ন সময় নাশকতা অভিযোগ এনে থানায় মামলা করা হয়। ওই মামলারগুলো তদন্তকালে আটককৃতদের বিরুদ্ধে নাশকতার অভিযোগ ও শিবির কর্মী হওয়ার প্রমাণ মেলে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। তদন্তকালেও ভুক্তভোগীরা কেউই নির্যাতনের অভিযোগ করেননি। আর পুলিশও তদন্তে তাদের ওপর নির্যাতন করার কোনও প্রমাণ পায়নি।