মৎস্যজীবী তালিকায় ইউপি সদস্যসহ প্রভাবশালীদের নাম!

ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ সময়ে ক্ষতিপূরণ হিসেবে সরকারি সহায়তা না পেয়ে খুলনার কয়রা উপজেলার প্রকৃত জেলেদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। অভিযোগ উঠেছে, কার্ডধারী জেলেদের তালিকায় স্থানীয় ইউপি সদস্যসহ প্রভাবশালীদের নাম রয়েছে। যারা পেশায় জেলে নন। কিন্তু এদের নামে রয়েছে কার্ড। আর প্রকৃত জেলেরা কার্ড পাচ্ছেন না।

মহারাজপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার ওহিদ মোড়ল। ২০১৬ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি ওয়ার্ড সদস্য নির্বাচিত হন। গত ৫ বছরে মাছ ধরতে না গেলেও মৎস্যজীবীদের জন্য বরাদ্দ ভিজিএফ চাল তুলতে ভুল করেননি তিনি। ওহিদ মোড়লসহ তার আপন তিন ভাই জেলে পরিচয়পত্রধারী। অথচ প্রকৃত মৎস্যজীবীরা রয়েছেন তালিকার বাইরে। ফলে নিষেধাজ্ঞার সময়ে বরাদ্দকৃত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।

অভিযোগ রয়েছে, মৎস্যজীবী হিসেবে সংযুক্ত ৯৩৩ জনের অধিকাংশ ‘জেলে’ পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তাছাড়া নতুন সংযুক্ত তালিকায় এলাকার বিত্তবান অমৎস্যজীবীদেরও নাম রয়েছে।

উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, কয়রা উপজেলায় ২০২০ সালে জেলে তালিকা হালনাগাদের সময় ইউপি চেয়ারম্যানদের কাছে ‘উপজেলা পর্যায়ে জেলে নিবন্ধন ও পরিচয় পত্র কমিটি’ থেকে চিঠি দেওয়া হয়। তখনকার উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিমুল কুমার সাহা স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে ইউনিয়নের তালিকাভুক্ত মৎস্যজীবীদের মধ্যে পেশা পরিবর্তন, মৃত ও স্থানান্তর হওয়া ব্যক্তিদের নাম বাদ দিয়ে এবং তালিকা বহির্ভূত প্রকৃত মৎস্যজীবীদের নাম সংযুক্ত করে নতুন তালিকা পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, তালিকায় কোন অসংগতি পরিলক্ষিত হলে তার সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের ওপর বর্তাবে। পরে ওই বছরের ১১ জুন ‘উপজেলা পর্যায়ে জেলে নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র কমিটি’র সর্বসম্মতিক্রমে পূর্বের কার্ডধারী ১০৯২ জনের মধ্যে ২৫ জনকে বাদ ও ৯৩৩ জনকে নতুন সংযুক্ত করে মহারাজপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পাঠানো তালিকার অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই তালিকায় ৫৬৫ নম্বরে মহারাজপুরের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার ওহিদ মোড়ল (জেলে আইডি-৭৬৮০২৮), ৫৬২ নম্বরে তার ভাই নূর ইসলাম মোড়ল (জেলে আইডি-৭৬৮০৩৯), ৫৬৩ নম্বরে শরিফুল মোড়ল (জেলে আইডি- ৭৬৮০২৬) ও ৫৭৪ নম্বরে জামাল মোড়ল (জেলে আইডি-৬৯৬৮০০) এর নাম রয়েছে।

তালিকায় মৎস্যজীবী হিসেবে সংযুক্ত নতুন (যারা এখন জেলে পরিচয়পত্রধারী নয়) ও পুরাতন মিলে ১ হাজার ৭৭০ জনকে উপজেলা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২ বার ভিজিএফ’র চাল দেওয়া হয়েছে।

মহারাজপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে ২০ থেকে ২৫ জন মৎস্যজীবী (যারা নিয়মিত সমুদ্রে মাছ আহরণে যায় এবং বিএলসি রয়েছে) বলেন, তারা দীর্ঘদিন থেকে সমুদ্রে মাছ ধরে জীবীকা নির্বাহ করছেন। মাছ ধরায় সরকারি নিষেধাজ্ঞার সময়ে সংসার চালাতে কষ্ট হলেও সরকারি কোন সুযোগ সুবিধা তারা পান না। অথচ যারা জেলে পেশায় সম্পৃক্ত নন, এমন লোকজনও সরকারি চাল পাচ্ছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যক্তিরা অভিযোগ করেন, ইউপি মেম্বার বা সংশ্লিষ্টদের কাছে গেলে টাকা চায়। টাকা না দিলে অথবা তাদের ঘণিষ্ঠজন না হলে জেলে কার্ড দেয় না।

অভিযোগের বিষয়ে ইউপি সদস্য অহিদ মোড়ল বলেন, ৮/১০ বছর আগে মাছ ধরতাম। তখন তালিকাভুক্ত হই। তিনি বলেন, গত বছর দু’বার ভিজিএফ’র চাল পেয়েছিলাম। গত বছর জেলে পরিচয়পত্রধারীদের বাইরেও বেশ কিছু লোকের নামে উপজেলা থেকে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়।

মহারাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন (লাভলু) বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানান।

‘উপজেলা পর্যায়ে জেলে নিবন্ধন ও পরিচয় পত্র কমিটি’র সদস্য সচিব ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) এসএম আলাউদ্দিন বলেন, জনবলের ঘাটতি রয়েছে। তাই শতভাগ যাচাই-বাছাই করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। বেশ কিছু ব্যক্তির নামে অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে অমৎস্যজীবীদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

‘উপজেলা পর্যায়ে জেলে নিবন্ধন ও পরিচয় পত্র কমিটি’র সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, গত বছরের ১১ জুন উপজেলা কমিটির সর্বশেষ তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছিল। সেখানে মহারাজপুর ইউনিয়ন থেকে পূর্বের কার্ডধারী ১০৯২ জনের মধ্যে ২৫ জনকে বাদ দিয়ে ও ৯৩৩ জনকে নতুন সংযুক্ত করে পাঠানো তালিকা চূড়ান্ত হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। যা আমি যোগদান করার পর জেনেছি। অভিযোগের বিষয়ে জেনেছি। তদন্ত করে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।