সাতক্ষীরায় দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি, ভেসে গেছে তিন হাজার হেক্টর চিংড়ি ঘের

ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে সাতক্ষীরার চার উপজেলার বিভিন্ন নদীর বাঁধ ভেঙে ৩৫ হাজার পরিবারের দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। উপকূলের গাবুরা, পদ্মপুকুর, প্রতাপনগরসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে জোয়ার-ভাটা চলছে। এরই মধ্যে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে ছয় শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ভেসে গেছে তিন হাজার ছয় হেক্টর চিংড়ি ঘের।

বৃহস্পতিবার (২৭ মে) সকালে জোয়ারের চাপে পানি উন্নয়ন বোর্ড-১ এবং ২-এর আওতাধীন ৫৩ পয়েন্টে বাঁধ ছাপিয়ে এবং ২০ কিলোমিটার বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢোকে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ইয়াসের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২০ কিলোমিটার বাঁধ ভেঙে বিপুল পরিমাণ কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পানিবন্দি হয়ে পড়ে ৩৫ হাজার পরিবারের দেড় লাখ মানুষ। পানিতে ভেসে গেছে ছয় উপজেলার তিন হাজার ছয় হেক্টর চিংড়ি ঘের। এতে সাত কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। পানির তোড়ে শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার প্রধান প্রধান সড়কের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। আশ্রয়কেন্দ্রে না উঠলেও গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি নিয়ে বাড়ির নিকটবর্তী উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে বহু মানুষ।

এর আগে বুধবার (২৬ মে) সকালে এবং রাতে জোয়ারের চাপে শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ইউনিয়নের ঝাপা গ্রামে বেড়িবাঁধের চারটি পয়েন্ট, পাতাখালির দুটি পয়েন্ট, রমজাননগরের দুটি পয়েন্ট, গাবুরার তিনটি পয়েন্ট, কৈখালির দুটি পয়েন্ট, ভেটখালি জামে মসজিদের সামনের একটি পয়েন্ট, বুড়িগোয়ালিনীর তিনটি পয়েন্ট ও নূরনগর ইউনিয়নের একটি পয়েন্টসহ অন্তত ১৭টি স্থানের বেড়িবাঁধ উপচে অনেক গ্রামে পানি ঢোকে।

এদিকে শ্যামনগরের গাবুরার জেলেখালি, নেবুবুনিয়া, চাঁদনীমুখা, গাগড়ামারি, পদ্মপুকুরের উত্তর ও দক্ষিণ পাতাখালি, কামালকাটি, ঝাঁপা ও সোনাখালিসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম জোয়ারের পানিতে ভাসছে। গ্রামবাসী ও জনপ্রতিনিধিরা বালুর বস্তা এবং মাটি ফেলে বাঁধ সংস্কারের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জিএম মাছুদুল আলম, পদ্মপুকুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান, বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাবু ভবতোষ মন্ডল, মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কামেশ মোড়ল, কৈখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ আব্দুর রহিম ও স্থানীয়রা এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আ. ন. ম. আবুজর গিফারী বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে সরকারি সাহায্য হিসেবে প্রতি ইউনিয়নে ২৫ হাজার টাকা ও দুই মেট্রিক টন করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শুকনা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, কালিগঞ্জের পূর্ব নারায়ণপুর গ্রামের জব্বারের মাছের ঘের সংলগ্ন পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ ভেঙে উপজেলা হাসপাতাল, আব্দুস সামাদ স্মৃৃতি মাঠ, বাস টার্মিনালসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম কাকশিয়ালী নদীর পানিতে তলিয়ে গেছে।

এছাড়া কালীগঞ্জ সোহরাওয়ার্দী পার্কের পাশে কাকশিয়ালী নদীর পানি উপচে উপজেলা সদরের বেশ কিছু এলাকা তলিয়ে গেছে। উপজেলা পরিষদের পাশের যমুনা নদীর উপর নির্মিত স্লুইসগেটের পাটাতন বন্ধ থাকায় সেখান থেকে পানি উপচে নাজিমগঞ্জ বাজার, উপজেলা পরিষদ চত্বরসহ বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে গেছে। উপজেলার ঘোজাডাঙা এলাকায় কাকশিয়ালী নদীর বাঁধ উপচে উত্তর শ্রীপুর ও দক্ষিণ শ্রীপুরসহ তিনটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কপোতাক্ষের পানিতে আশাশুনি উপজেলার কুড়িকাহুনিয়া লঞ্চঘাট, হরিশখালি, চাকলা, রুইয়ার বিল, সুভদ্রকাটি, দিঘলারআইটসহ কয়েক পয়েন্টের বেড়িবাঁধ উপচে ও ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকেছে। আশাশুনি সদরের দয়ারঘাট ও বলাবাড়িয়ায় বেড়িবাঁধ উপচে বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার খাজরা ইউনিয়নের পিরোজপুরের রাজবংশীপাড়ায় কপোতাক্ষ নদের বাঁধ উপচে বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আশাশুনির দয়ারঘাট ও বলাবাড়িয়ায় খোলপেটুয়া নদীর বাঁধ উপচে কয়েক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বড়দল ইউনিয়নের বামনডাঙ্গা বেড়িবাঁধ উপচে জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকছে। দেবহাটা উপজেলার ইছামতী নদীর কোমরপুরে বেড়িবাঁধ উপচে কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সদর উপজেলার হাড়দ্দহ মসজিদের পাশে ও তালা উপজেলার পাখিমারা বিলে টিআরএম'র বাঁধ ভেঙে কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

এছাড়া বিভিন্ন স্থানে কালভার্ট ধসে নদীর পানি বিভিন্ন গ্রামে ঢুকছে। শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের সেতু উপচে চুনা নদীর পানিতে তলিয়ে গেছে কয়েকটি গ্রাম। তবে এখন পর্যন্ত প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। গ্রামবাসী তাদের গবাদিপশু ও সহায়-সম্পদ নিয়ে আতঙ্কিত।

সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক (ডিসি) এসএম মোস্তফা কামাল বলেন, জলোচ্ছ্বাসে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২০ কিলোমিটার বাঁধ ভেঙে বিপুল পরিমাণ কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ৩৫ হাজার পরিবারের দেড় লাখ মানুষ। পানিতে ভেসে গেছে ছয় উপজেলার তিন হাজার ছয় হেক্টর চিংড়ি ঘের। এতে ক্ষতি হয়েছে সাত কোটি টাকা।