মোংলা বন্দরের ইনারবার ড্রেজিং জটিলতা কাটছেই না

মোংলা বন্দরের ইনারবার (হাড়বাড়িয়া থেকে মোংলা জেটি পর্যন্ত) ড্রেজিং প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা নিরসন হচ্ছে না। কৃষকদের দাবি, সেখানে তাদের ৩ ফসলি জমি হারাতে হবে। তাই বানিশান্তার তিনশ একর বাদ দিয়ে বিকল্প ৫টি স্থানের প্রস্তাব করেন সংশ্লিষ্টরা। আর বন্দর থেকে বলা হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে সেখানকার সব জমি ৩ ফসলি নয়। ওই ৩শ একর ২ বছর ব্যবহারের জন্য হুকুম দখল নিয়ে ১০ বছরের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। ২ বছর পর আবার কৃষকদের জমি ফেরত দেওয়া হবে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে মোংলা বন্দরের ইনারবার ড্রেজিং জরুরি এবং তা দ্রুত বাস্তবায়ন দাবি জানানো হয়।

বুধবার (৭ সেপ্টেম্বর) খুলনা প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সৈয়দ জাহিদ হোসেন বলেন, মোংলা বন্দর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর হলেও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ দেশের সার্বিক উন্নয়নে এ বন্দরের ভূমিকা অপরিসীম। এটি অপার সম্ভাবনার কেন্দ্রস্থল। বন্দরের ইনারবারে ৮.৫০ মিটার সিডি (চার্টডেটাম) গভীরতায় ড্রেজিং করা হলে মোংলা বন্দরের জেটিতে স্বাভাবিক জোয়ারের সহায়তায় ৯.৫০-১০ মিটারের অধিক ড্রাফটের জাহাজ নির্বিঘ্নে হ্যান্ডেল করা সম্ভব। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরেও সর্বোচ্চ ৯.৫০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ হ্যান্ডেল করা হচ্ছে। সে বিবেচনায় পশুর চ্যানেলের ইনারবারে ড্রেজিং করা হলে মোংলা বন্দরকে চট্টগ্রাম বন্দরের সমান সক্ষমতার একটি কার্যকর বিকল্প বন্দরে পরিণত করা সম্ভব।

শিপিং এজেন্ট ওয়াহিদুজ্জামান খান বলেন, পদ্মা সেতু, খানজাহান আলী বিমানবন্দর, রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র, খুলনা- মোংলা রেললাইন, পদ্মা সেতু সংলগ্ন ভাঙা-মোংলা মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীতকরণ, রিকন্ডিশন গাড়ি আমদানি, দেশের চলমান মেগা প্রকল্পের মালামাল আমদানি, ঢাকার গার্মেন্টস পণ্য রফতানিসহ নানাবিধ সুফলে যখন মোংলা বন্দরের কর্মচাঞ্চল্য বেড়েছে, ঠিক তখনই মোংলা বন্দরের এ উন্নয়নে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এ ড্রেজিং প্রকল্প বাধাগ্রস্ত হলে মোংলা বন্দরে আবারও অচলাবস্থা সৃষ্টির শঙ্কা রয়েছে। একটি বন্দরের প্রধান চালিকা শক্তি হলো তার চ্যানেল-নৌপথ। সেই চ্যানেলটি যদি সুরক্ষিত না থাকে তাহলে বন্দরের পণ্যবাহী বড়বড় বিদেশি জাহাজের আগমন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বন্দরের আমদানি-রফতানিসহ জাতীয় অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়ে, নদীর মাটি পলিমিশ্রিত হওয়ায় সেখানে ফসলের উৎপাদনশীলতা আরও বাড়বে। তাদের দাবি , মোংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলে ড্রেজিং করে নদের তীরবর্তী স্থানে পলিমাটি মিশ্রিত বালি ফেলার কারণে সেখানে তরমুজসহ অন্যান্য বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। পশুর নদে ড্রেজিংয়ের কাজ বন্ধ হলে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হবে। এ কারণে প্রকল্পের কাজ চলমান রাখা জরুরি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) মোংলা প্রতিনিধি মো নুর আলম বলেন, আমরা পশুর নদীর খননের বিরুদ্ধে নই। আমরা বলছি এটি বানিশান্তার তিনশ একর তিন ফসলি কৃষি জমিতে না ফেলে বিকল্প জায়গায় ফেলা হোক। বিকল্প প্রস্তাবে আমরা বলেছি খানজাহান আলী বিমান বন্দরে ৬০০ একর জমি, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৯০০ একর, মোংলা বন্দরের নিজস্ব জমি, খুলনা-মোংলা ফোর /সিক্স লেন সড়কের পাশে, এছাড়া চিলা এলাকায় যেখানে ইতোমধ্যে ফেলেছে সেখানেও জমি আছে। দুই বছর আগে থেকেই বানিশান্তার কৃষক এবং জনপ্রতিনিধিরা আন্দোলন করে যাচ্ছে। অথচ বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রকল্প রিভিউ করলেও কৃষক, জনপ্রতিনিধি এবং গবেষকদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছে।

এ বিষয়ে খুলনা জেলা প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন, ইতোমধ্যেই মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষকে হুকুম দখলকৃত ওই ৩শ একর জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, খুলনা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওই জমি বুঝিয়ে দেওয়ার পর থেকে একটি মহল সেখানে বালু ফেলার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। সেখানকার প্রকৃত জমির মালিকদের ভুল বুঝিয়ে ও উসকানি দিয়ে বহিরাগত কিছু সুবিধাভোগী লোকজন বালু ফেলার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম মুসা বলেন, বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ওই চক্রের বিরুদ্ধে মোংলা বন্দরের উন্নয়ন বাধা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

তিনি বলেন, ইনারবার ড্রেজিংয়ের বালু পশুর নদীর পাড়ের বানিশান্তা এলাকায় ফেলার জন্য গত ৮ জুন খুলনা জেলা প্রশাসকের কাছে জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণের ৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারপরও জমির মালিকদের সেই ক্ষতিপূরণের টাকা বিতরণ কিংবা হস্তান্তরে এত বিলম্ব কেন হচ্ছে তা বুঝতে পারছি না। জমির মালিকেরা তাদের জমিতে বালু ফেলতে ও ক্ষতিপূরণ নিতে আগ্রহী। কিন্তু মাঝখানে একটি উন্নয়ন বিরোধী চক্র প্রকৃত জমির মালিক ও বর্গা চাষিদেরকে ভুল বুঝিয়ে সেখানে একটি প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে।

চলমান এ ড্রেজিং প্রকল্প বাস্তবায়নে তিনি খুলনা জেলা ও স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিসহ বন্দর সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত বলেন, একটি বন্দরের প্রধান চালিকা শক্তি হলো তার চ্যানেল/নৌপথ। আর মোংলা বন্দরের সেই চ্যানেলটি যদি সুরক্ষিত না থাকে, তাহলে বন্দরের পণ্যবাহী বড় বড় বিদেশি জাহাজের আগমন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বন্দরের আমদানি-রফতানিসহ জাতীয় অর্থনীতিতে।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম বলেন, পরিকল্পনা নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে মোংলা বন্দর। যার প্রেক্ষিতে সম্প্রতি শেষ হয়েছে বন্দরের আউটারবার ড্রেজিংয়ের কাজ। ইতোমধ্যে যার সুফল ভোগ করছি আমরা। এখন আমাদের বড় বড় পণ্যবাহী বিদেশি জাহাজ সরাসরি চলে আসছে হাড়বাড়িয়া পর্যন্ত। আর ইনারবার ড্রেজিং সম্পন্ন হলে হাড়বাড়িয়া ছাড়িয়ে বন্দর জেটি ও রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভিড়তে পারবে আমদানি-রফতানি পণ্যবাহী বড় বড় বিদেশি জাহাজ। আমরা চাই বন্দর কর্তৃপক্ষ সকল প্রতিকূলতা দূর করে ড্রেজিং প্রকল্প শেষ করবে।