খুলনার খালিশপুর জুট ওয়ার্কার্স ইনস্টিটিউটের মডেল শপিং কমপ্লেক্সের ২৭টি দোকান গত তিন বছর ধরে পাটকল শ্রমিক নেতাদের নেতৃত্বে জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন। এতে করে তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছিলেন। খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) দুপুর ১২টার দিকে তাদের দোকানের তালা খুলে দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিগত দিনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হলে আদালত দোকানগুলো আগামী এক মাসের মধ্যে খুলে দেওয়ার জন্য খুলনার জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিলেও আওয়ামী লীগ নেতাদের চাপের মুখে তা খোলা হয়নি। গত ৭ আগস্ট বিচারপতি কে এম কামরুল কাদির ও বিচারপতি মোহাম্মদ আলী বেঞ্চ রিট পিটিশনের শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। রিট পিটিশনে ছয় জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে ২ নম্বর আসামি হলেন জেলা প্রশাসক। তাকেই আদালত বাদীদের দোকানগুলোতে যারা অবৈধভাবে তালা দিয়েছে, তা খুলে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
ক্ষতিগ্রস্ত দোকানদারদের মধ্যে সোহেল মাহমুদ পলাশ হাইকোর্টে এই রিট পিটিশন করেন। গত ১ আগস্ট ২২ তিনি রিট পিটিশন দাখিল করেন বলে জানান বাদীর আইনজীবী গাজী মুসতাক আহমেদ। তিনি বলেন, আদালতের আদেশ রিসিভ করার পর এক মাসের মধ্যে দোকানগুলো খুলে দেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু রাজনৈতিক চাপে দোকান খুলতে পারেননি তিনি।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম পলাশ জানান, ২০২১ সালের ২০ এপ্রিল দিবাগত রাত ২টার দিকে শ্রমিকনেতা মুরাদ হোসেন ও হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বে একদল শ্রমিক তাদের মডেল শপিং কমপ্লেক্সের গেট তালা দিয়ে দেয়। এমনকি তালা যাতে না খুলতে পারে এজন্য সিলগালা করা হয়। অনেক দফতরে এ ব্যাপারে গেলেও তালা খোলার কোনও ব্যবস্থা হয়নি। এতে করে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করেছেন। অবশেষে ছাত্ররা এসে বৃহস্পতিবার দুপুরে তাদের দোকান খুলে দেন। তারা ছাত্রদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানান।
আরেক ব্যবসায়ী ডা. মো. নজরুল ইসলাম সজল জানান, নগরীর খালিশপুর জুট ওয়ার্কার্স ইনস্টিটিউটের মডেল শপিং কমপ্লেক্সের ব্যবসায়ী তারা। এই কমপ্লেক্সে বিভিন্ন ধরনের ৩০টি দোকান রয়েছে তাদের। দীর্ঘদিন ধরে তারা দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনা করে আসছেন। বিজেএমসি সব জুট মিল বন্ধ করে দেয়। এরপর পাটকল শ্রমিক সংগঠন দ্বারা পরিচালিত খালিশপুর জুট ওয়ার্কার্স ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় শ্রমিক নেতা শাহানা, হুমায়ুন, মুরাদসহ কতিপয় ব্যক্তি এসে দোকান ঘরের জামানত ও ভাড়া অতিরিক্ত দাবি করে এবং বিরক্ত করতে থাকে। এতে বাধ্য হয়ে তারা জেলা প্রশাসক বরাবর একটি আবেদন করেন। এমনকি মাকের্টের জমির মালিকানা নিয়ে সমস্যা থাকায় তারা দোকান ঘরের ভাড়া আদালতে জমা দিয়ে যাচ্ছেন। এরপর চক্রটি ক্ষুব্ধ হয়ে মার্কেটে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। অনেক চেষ্টা করে দীর্গ তিন বছরেও তালা খুলতে পারেননি। এতে তাদের কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
কোনও উপায় না পেয়ে গত ১৬ আগস্ট ২১ ক্ষতিগ্রস্ত দোকানদার শরিফুল ইসলাম জেলা প্রশাসকের নিকট আবেদন করেছেন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, তারা মার্কেটের ৪৮ জন দোকানদার বৈধভাবে সরকারের নিকট থেকে বরাদ্দ পেতে চায়। ইতোমধ্যে তারা জেলা প্রশাসকের নিকট দোকান ঘরের প্রতি মাসের ভাড়া জমা দিয়ে আসছে। তারই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চান এসব ব্যবসায়ী। কিন্তু সাবেক প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান, সাবেক মেয়র তালুকদার আ. খালেক, সাবেক এমপি এসএম কামাল হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা আশরাফ, নান্নু, জিয়ার বাধার মুখে তারা তালা খুলতে পারেননি। তারাই দখলে রেখেছিলেন। ভেতরে থাকা মালামাল সব পচে গলে নষ্ট হয়ে যায়। এতে অনেক ক্ষতি হয়েছে তাদের।
গত ৫ আগস্ট ক্ষমতার পরিবর্তন হওয়ায় ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন মহলে নতুন করে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন। তারই ধারাবাহিকতায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ছাত্ররা বৃহস্পতিবার ওই মার্কেটের তালা খুলে দেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি রাউফুল নাছিম শিশির বলেন, ‘আমরা ছাত্র সমাজ যেখানে নির্যাতন ও বৈষম্য দেখছি, সেখানেই যাচ্ছি। এই নির্যাতনের শিকার মানুষদের রক্ষা করে চলেছি। তারই ধারাবাহিকতায় মডেল শপিং কমপ্লেক্সের নির্যাতিন ৩০ জন দোকানদের ন্যায্য দাবি পূরণ করতে বৃহস্পতিবার সেখানে যাই। তাদের বন্ধ করে রাখা দোকান খুলে দেওয়া হয়। মানবেতর জীবন যাপন করা ব্যবসায়ীরা দোকান খুলতে পেরে খুব খুশি। তারা আমাদের জন্য প্রাণ খুলে দোয়া করেছেন। এটাই আমাদের জন্য বড় পাওয়া।’