কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালন স্মরণ উৎসব শুরু হচ্ছে মঙ্গলবার

Kushtia Lalon Vaskor Pic

দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ’র আখড়া বাড়িতে দেশ-বিদেশের ভক্ত-অনুরাগী-দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন। ২২ মার্চ (মঙ্গলবার) থেকে শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী লালন স্মরণ উৎসব। এরই মধ্যেই মাজার প্রাঙ্গণ ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে এক বর্ণিল পরিবেশে সৃষ্টি করেছে লালন একাডেমি কর্তৃপক্ষ। ভক্ত অনুসারীরা আগে থেকেই লালন আখড়ায় জায়গা করে নিতে শুরু করেছেন।

২২ মার্চ থেকে শুরু হয়ে উৎসব চলবে ২৪ মার্চ পর্যন্ত। প্রতিদিন সন্ধ্যায় স্মরণোৎসবে থাকবে আলোচনা সভা, লালন সঙ্গীতানুষ্ঠান ও গ্রামীণ মেলা। কোনও এক চৈত্রের দোল পূর্ণিমায় কুষ্ঠ রোগী লালন কালী নদীতে ভেলায় ভাসতে ভাসতে কুষ্টিয়ার এই ছেঁউড়িয়ায় আসেন। এখানকার বাসিন্দা মলম শাহ তাকে উদ্ধার করে সেবা-চিকিৎসা করে বাঁচিয়ে তোলেন। লালন শাহ তার জীবদ্দশায় ছেঁউড়িয়ার এই আখড়াবাড়িতে প্রতিবছর চৈত্রের দোল পূর্ণিমা রাতে বাউলদের নিয়ে এ উৎসব করতেন। ১২৯৭ বঙ্গাব্দের পয়লা কার্তিক তার মৃত্যুর পরও এ উৎসব চালিয়ে আসছেন লালনের অনুসারীরা। এটিকে দোল উৎসব হিসেবেই জানেন লালন অনুসারীরা।

লালনভক্তদের মতে, লালন সাঁইজি তার গানের মধ্যে দিয়ে জাতপাতহীন সমাজ ব্যবস্থার দর্শন দেখিয়েছেন। তিনি গানের মধ্যে দিয়ে সমাজের ধর্মান্ধ, গোঁড়ামি, শাসকদের পক্ষপাত বিচার ও বৈষম্য দূর করার পথ দেখিয়েছেন। সব ধর্মের ঊর্ধ্বে থেকে মরমী সাধক বাউল সম্রাট ফকির লালন মানবমুক্তির জন্য সৃষ্টি করেছিলেন ফকিরী মতবাদ। তার মানবমুক্তির আলোকিত সৃষ্টি বাউল গান নিয়ে সারা বিশ্বের ভক্ত ও অনুরাগীরা তাকে চিনেন, জানেন ও হৃদয়ে লালন করেন।

সিরাজগঞ্জের প্রবীণ বাউল সাধক কলিম শাহ বলেন, বছরে দু’বার সাঁইজির বারামখানায় সাধু-গুরুদের মিলন মেলা বসে। এই দিন আসলে কিছুতেই বাড়িতে মন টেকে না। সংসারের সব মায়ার সুতো ছিঁড়ে চলে আসি আখড়া বাড়ি। গত ৩০ বছর ধরে এমনটাই করে আসছি।

আরেক বাউল সাধক ফকির জিল্লু শাহ বলেন, আগে আসলে সাঁইজির মাজারের কাছাকাছি বসার জায়গা মেলে। আবার অনেক দিন এখানে কাটানো যায়। এর যে কী আনন্দ, কী স্বাদ তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।

লালন একাডেমির সার্বিক তত্ত্বাবধায়ক (খাদেম) মোহাম্মদ আলী বলেন, মরমী এ সঙ্গীত সাধকের বার্ষিক স্মরণ উৎসব উপলক্ষে তার সাধন-ভজনের তীর্থ স্থান ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণ পরিণত হয়েছে উৎসবের পল্লীতে। দেশ-বিদেশ থেকে এখানে আগমন ঘটেছে লালনভক্ত, বাউল অনুসারী ও সুধীজনসহ অসংখ্য মানুষের।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও লালন গবেষক ড. আবুল আহসান চৌধুরী বলেন, বাউল সাধক ফকির লালন শাহর জীবদ্দশায় দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে পালন করা হতো দোল উৎসব। আর দোল পূর্ণিমা ঘিরেই বসতো সাধু সংঘ। লালনের সেই স্মৃতির ধারাবাহিকতায় লালন একাডেমিও প্রতিবছর এ উৎসবটিকে ‘লালন স্মরণ উৎসব’ হিসাবে পালন করে আসছে। তবে লালন অনুসারীরা দিনটিকে ‘দোল পূর্ণিমা’ উৎসব হিসাবেই পালন করে থাকেন।

ফকির হৃদয় সাঁই বলেন, সত্যিকার অর্থে লালন অনুসারীরা দোল পূর্ণিমার এ রাতটির জন্য সারা বছর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকেন। সাঁইজির রীতি অনুসারে দোল পূর্ণিমার রাতে অধিবাসের মধ্য দিয়ে ২৪ ঘণ্টার দোলসঙ্গ শুরু হয়।এই রাতে জ্যোৎস্নার ছটায় আর মাতাল হাওয়ায় গানে গানে বাউল সাধকরা হারিয়ে যায় ভিন্ন কোনও জগতে। পরের দিন চারটায় ‘পুণ্যসেবা’ দিয়ে সাধুসঙ্গ শেষ করে আখড়াবাড়ি ত্যাগ করে থাকে বেশির ভাগ সাধু।

 লালন একাডেমির সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) সেলিম হক বলেন, ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস, এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন চলছে। এ কারণে এবার তিন দিনের উৎসব করা হবে।

কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক (ডিসি) সৈয়দ বেলাল হোসেন  জানান, অন্যান্য বারের তুলনায় এবার আরও বেশি লালন ভক্ত অনুসারীদের সমাগম ঘটবে। আর এ উৎসবকে নির্বিঘ্ন রাখতে পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েক বলয়ের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

/জেবি/ টিএন/