লাভজনক হলেও বেসরকারি খাতে বেনাপোল-মোংলা কমিউটার, যাত্রীদের ক্ষোভ 

দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনপ্রিয় ‘বেনাপোল-খুলনা-মোংলা’ (বেতনা) কমিউটার ট্রেনটি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। রবিবার (১১ জানুয়ারি) থেকে ‘এইচ এন্ড এম ট্রেডিং কর্পোরেশন’ নামের একটি বেসরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই ট্রেনের বাণিজ্যিক ও টিকিট ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম শুরু করেছে। লাভজনক এই রুটটি বেসরকারি খাতে দেওয়ায় সাধারণ যাত্রী ও সেবা প্রত্যাশীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সরকারি ব্যাবস্থাপনায় রেল চলাচলের দাবি তাদের। 

বেনাপোল রেলস্টেশন মাস্টার আয়নাল হাসান জানিয়েছেন, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গেলেও ট্রেনের ভাড়া আগের মতোই থাকছে। তবে বড় পরিবর্তন এসেছে সময়সূচিতে। আগে প্রতি মঙ্গলবার ট্রেনটি বন্ধ থাকতো, এখন থেকে সপ্তাহের সাত দিনই এই রুটে ট্রেন চলাচল করবে। 

রেলওয়ে কর্মকর্তাদের দাবি, বর্তমান আয়ের চেয়ে বেশি রাজস্ব পাওয়ার লক্ষ্যেই নীতিমালা মেনে তিন বছরের জন্য এই ট্রেনটি লিজ দেওয়া হয়েছে। 

পাকশীতে কর্মরত রেলওয়ের চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার মিহির কুমার গুহ জানান, কোনও কোম্পানি যদি গত ছয় মাসের আয়ের চেয়ে বেশি টাকা দেওয়ার নিশ্চয়তা দেয়, তবে তাদের লিজ দেওয়া সম্ভব। তবে লিজ বাতিলের ক্ষমতাও রেলওয়ের হাতে থাকবে। 

অন্যদিকে, যাত্রীরা বলছেন, ট্রেনটি বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা আয় করছে। স্টেশনে পর্যাপ্ত টিকেট চেকার নিয়োগ করলে সরকারি ব্যবস্থাপনায় আয় আরও বাড়ানো সম্ভব ছিল। 

যাত্রী সাইফুল ইসলাম সাঈদ বলেন, “খুলনা থেকে বাসযোগে বেনাপোল আসতে সময় লাগে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা। ভাড়া ২৫০ টাকা। আর কমিউটার ট্রেনে খুলনা থেকে বেনাপোল আসতে সময় লাগে আড়াই ঘণ্টা, ভাড়া মাত্র ৪৫-৫০ টাকা।”  

আরেক যাত্রী মাহমুদুল হাসান নাবিল জানান, বেসরকারি খাতে গেলে সেবার মান কমে যাওয়া এবং চোরাকারবারিদের দৌরাত্ম্য বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই লাভজনক ট্রেনটি যাতে বেসরকারি খাতে লিজ দেয়া না হয় তার জন্য রেলের উর্ধতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি। 

রেল সূত্র জানায়, লাভজনক রুটটি বেসরকারি টিকেট ব্যবস্থাপনার জন্য ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল দরপত্র আহ্বান, ১৯ মে দরপত্র খোলা এবং জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে যাচাই-বাছাই শেষে রেলের মূল্যায়ন কমিটিতে পাঠানো হয়। পরে যাচাই-বাছাই শেষে ‘এইচ এন্ড এম ট্রেডিং কর্পোরেশন’ নামের প্রতিষ্ঠানকে তিন বছরের জন্য কার্যদেশ দেয়া হয় ট্রেনটির টিকিট ব্যবস্থাপনায়। 

টেন্ডার পাওয়া ‘এইচ এন্ড এম ট্রেডিং কর্পোরেশন’ এর মালিক হুমায়ন আহমেদ জানান, আমরা কাজ পেয়েছি। অনেক আগেই আমাদের দায়িত্বে এ রুটটি চলার কথা ছিল। তবে বাজেটসহ অন্যান্য কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। রবিবার (১১ জানুয়ারি) থেকে বেসরকারি টিকিট ব্যবস্থাপনায় আমাদের দায়িত্বে এ রুটে ট্রেন চলাচল করবে। 

১৯৯৯ সালে এই রুটটি চালুর পর ২০১০ সাল পর্যন্ত সরকারিভাবে পরিচালিত হয়। এরপর দুই দফায় বেসরকারি খাতে ‘মেসার্স বান্না এন্টারপ্রাইজ’ ও ‘ইসলাম শিপ বিল্ডার্স’ চুক্তিবদ্ধ হয়ে এই ট্রেন পরিচালনা করে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় সেবার মান নিম্নমুখী হওয়া এবং ট্রেনের নিয়ন্ত্রণ চোরাকারবারিদের দখলে চলে যাওয়ায় ২০১৩ সালে আবার তা সরকারি নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। ২০১৭ সাল থেকে রুটের গুরুত্ব বিবেচনায় দিনে দুইবার ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনওরকম জনমত যাচাই বা আন্দোলন এড়াতে অনেকটা গোপনেই এই লিজ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ট্রেনের বগি কমে যাওয়া এবং যাত্রী ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কায় রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাধারণ মানুষ।