বিশ্বকাপ ফুটবল সামনে রেখে ধারাবাহিকভাবে জার্মানির পতাকা তৈরি ও প্রদর্শন করে আসছেন আমজাদ হোসেন (৭২)। এবারও প্রিয় দলের প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ পতাকা টাঙিয়েছেন। তার স্বপ্ন, একদিন এই বিশাল পতাকা জার্মানির কোনও জাদুঘরে স্থান পাবে। বিশ্বকাপ জিতলে তিন গুণ বড় পতাকা বানাবেন।
মাগুরা সদর উপজেলার ঘোড়ামারা গ্রামের নেহাল উদ্দিন মোল্যার ছেলে আমজাদ পেশায় একজন কৃষক। বুধবার (১০ জুন) সকালে সদর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে আমজাদ হোসেন নিজের তৈরি সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ পতাকাটি প্রদর্শন করেন। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে আয়োজিত এ প্রদর্শনী ঘিরে মাঠজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের ভিড় দেখা যায়।
সকালে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে ছোট একটি ট্রাকে বলের আদলে মোড়ানো পতাকাটি মাঠে আনা হয়। পরে সমর্থকদের উপস্থিতিতে পতাকাটি উন্মোচন করা হলে পুরো এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এই আয়োজন দেখতে ঢাকা থেকেও অনেক ফুটবলপ্রেমী মাগুরায় ছুটে এসেছেন। মাঠে উপস্থিত এক দর্শনার্থী জানান, ২০০৬ সাল থেকেই তিনি এই পতাকা প্রদর্শনী দেখতে আসছেন। পুরো এলাকায় যে ফুটবল উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়েছে, তা সত্যিই অভূতপূর্ব।
আমজাদ হোসেন জানান, জার্মানির প্রতি তার এই গভীর ভালোবাসার পেছনে রয়েছে এক বিশেষ স্মৃতি। ২০০৫ সালের দিকে তিনি জটিল শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হন। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে জার্মানি থেকে আমদানি করা একটি ওষুধ সেবন করে সুস্থ হয়ে ওঠেন। কৃতজ্ঞতা থেকেই ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে জার্মানিকে ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে একটি পতাকা তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। ২০০৬ সালে প্রায় দেড় কিলোমিটার (৩৫০ গজ) দীর্ঘ পতাকা তৈরি করেন। এরপর প্রতিটি বিশ্বকাপেই পতাকার দৈর্ঘ্য বাড়তে থাকে—২০১০ সালে ২ দশমিক ৫ কিলোমিটার, ২০১৪ সালে ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার, ২০১৮ সালে ৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার ও ২০২২ সালে তৈরি করেছিলেন এই সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ জার্মানির পতাকা। এ বছর সেটিই টাঙিয়েছেন।
শুরুর দিকে পরিবারের সমর্থন না পেলেও নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন আমজাদ। পতাকার দৈর্ঘ্য বাড়াতে তিনি জমি বিক্রি করেছেন। ২০১৪ সালে ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পতাকা তৈরির জন্য প্রায় ২০ শতক জমি ও ২০১৮ সালের বিশ্বকাপের আগে আরও ১০ শতক জমি বিক্রি করেন। ২০১৪ সালে জার্মানি বিশ্বকাপ জয়ের পর বাড়িতে প্রজেক্টরের মাধ্যমে খেলা দেখার আয়োজন করেন আমজাদ। পাশাপাশি একটি গরু জবাই করে এলাকাবাসীর জন্য ভোজের ব্যবস্থাও করেছিলেন।
ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ নজর কেড়েছে জার্মান দূতাবাসের। ২০১৪ সালে তৎকালীন জার্মান চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ফার্দিনান্দ ভন ওয়েহি মাগুরায় এসে তাকে সংবর্ধনা দেন এবং জার্মানি জাতীয় ফুটবল দলের ফ্যান ক্লাবের আজীবন সদস্যপদ প্রদান করেন।
আগামী দিনেও পতাকার দৈর্ঘ্য আরও বাড়ানোর আশা প্রকাশ করে আমজাদ বলেন, ‘এই পতাকা আমার কাছে সন্তানদের চেয়ে কম নয়।’ তবে তার জীবনের শেষ ইচ্ছা, এই বিশাল পতাকাটি যেন জার্মানির কোনও জাদুঘরে সংরক্ষিত রাখা হয়।
আমজাদ হোসেন বলেন, ‘ভালোবাসা থেকেই এটি করেছি। পতাকা তৈরি করতে এ পর্যন্ত ৩০ শতাংশ জমি বিক্রি করেছি। তবু কারও কাছে সাহায্য চাইনি। আমি যতদিন বেঁচে আছি, এই পতাকা তৈরি করতে চাই। এবার বিশ্বকাপে জার্মানি চ্যাম্পিয়ন হলে ২০৩০ সালে এর চেয়ে তিন গুণ বেশি বড় পতাকা বানাবো।’