‘বিএনপি সরকার খাল কাটার নামে অসহায় ছিন্নমূল মানুষের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর ভেঙে দিচ্ছে’ এমন অভিযোগে যে ভিডিও ফেসবুকে ছড়ানো হয়েছে, তা সত্য নয়। বিএনপি সরকারের চলমান খাল খনন কর্মসূচির সঙ্গে ওই ভিডিওর কোনও সম্পর্ক নেই।
মূলত খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প-সংলগ্ন এলাকায় চলমান পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নদী খনন কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও। নদী খননের পর তীরে ফেলা মাটি গড়িয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের কয়েকটি ঘরের দিকে চলে যাওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন ভুক্তেভোগী।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, ডুমুরিয়ার বরাতিয়া এলাকায় নদী খননকাজের যে প্রকল্প চলছে, তাতে প্রকল্পের কয়েকটি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীন নদী খনন প্রকল্পের অংশ। যা বিএনপি সরকারের খাল খনন কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগেই হাতে নেওয়া হয়েছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, যশোরের ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ছয়টি নদীর ৮১ কিলোমিটার খননকাজ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে শুরু করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবি)। প্রকল্পের মধ্যেই রয়েছে ভদ্রা নদী খনন। যে নদীর পাড়ে রয়েছে সরকারের আবাসন প্রকল্প। ২০২১-২২ ও ২০২৩ অর্থবছরে ডুমুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় গৃহহীন ও বাস্তচ্যুত অসহায় মানুষের জন্য নদীর চর ভরাট করে সরকারিভাবে গড়ে তোলা হয় আশ্রয়ণ প্রকল্প। শতাধিক পরিবার মাথা গোঁজার ঠাঁই পায়। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনায় ঘর নির্মাণ না করায় চুকনগর, কাঁঠালতলা ও বরাতিয়ার ১৩৯ ঘর ভদ্রা নদী খননের হুমকিতে পড়ে। অপরিকল্পিতভাবে প্রবহমান নদীর চরে ঘর তৈরি করায় নদীর সীমানা সংকুচিত হয়ে পড়ে। সেইসঙ্গে কয়েকটি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
চুকনগর আবাসন প্রকল্পের বাসিন্দা হযরত গাজী বলেন, ‘আমরা প্রায় চার বছর ধরে এখানে বসবাস করছি। এর মধ্যে নদী খননের কাজ শুরু হয়। এতে কয়েকটি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
পাউবো জানায়, ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকার প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে সাড়ে ৮১ কিলোমিটার নদী খননকাজ অব্যাহত রেখেছে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কাজ পরিচালিত হচ্ছে। খননকাজ শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ২৪ অক্টোবর। ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নদী খনন প্রকল্পের সমঝোতা স্মারক হয়েছিল ২০২৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের মধ্যে এটি স্বাক্ষরিত হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর খননকাজের উদ্বোধন করা হয়।
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, যশোরের সদর উপজেলার আংশিক, অভয়নগর, মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার ৫৪টি বিলের পানি নিষ্কাশিত হয় শ্রীনদীর ওপর নির্মিত ভবদহ স্লুইসগেট দিয়ে। পলি পড়ে এলাকার মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদীর বুক উঁচু হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি জমে এলাকার বিলগুলো প্লাবিত হচ্ছে। ২০১৬ সাল থেকে ভবদহ এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে বোরো আবাদ হচ্ছে না। এতে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পের আওতায় ছয়টি নদী পুনঃখননের কাজ চলছে। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩৯ কোটি ৯৮ লাখ ১৯ হাজার টাকা। প্রকল্পের আওতায় অভয়নগরের ভবদহ ২১-ভেন্ট স্লুইসগেট থেকে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার কাশিমপুর পর্যন্ত হরি নদীর ১৫ কিলোমিটার, উপজেলার কাশিমপুর থেকে কুলবাড়িয়া পর্যন্ত তেলিগাতী নদী ৫ কিলোমিটার পুনঃখনন কাজ চলমান রয়েছে। এ ছাড়া মনিরামপুরে ৩৫ কিলোমিটার, কেশবপুরে সাড়ে ১৮ কিলোমিটর ও অভয়নগরের ৭ কিলোমিটারসহ সর্বমোট সাড়ে ৮১ কিলোমিটর নদী খনন চলছে। এর পাশাপাশি ৪৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয়ে ভবদহ ও তৎসংলগ্ন বিল এলাকার জলাবদ্ধতা দ্রুত নিরসনের জন্য সেচ প্রকল্পের কাজও চলছে।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, নদী খনন দরকার। তবে ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসন করতে হলে নদী কাটার সঙ্গে সঙ্গে এলাকার যেকোনো বিলে পরিকল্পিত উপায়ে জোয়ার-ভাটা (টিআরএম) চালু করতে হবে। অন্যথায় খুব দ্রুতই নদী পলি পড়ে মরে যাবে।
ডুমুরিয়া উপজেলার চহেড়া গ্রামের নিলু সরকার ও রুদাঘরা গ্রামের শুভজিৎ গাইন জানান, আশ্রয়ণের কয়েকটি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সঙ্গে বর্তমানের সরকারের খাল খননের বিষয়টির কোনও সম্পৃক্ততা নেই। আর এখানে কোনও খাল খনন করা হচ্ছে না। প্রায় দেড় বছর ধরে নদী খননের কাজ চলছে। নদীর মাটি পাড়ে রাখায় আশ্রয়ণের কয়েকটি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ ঘরগুলো নদীর পাড়েই তৈরি করা হয়েছে।
বরুণা বিলের কৃষক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এখানে কোনও খাল খনন হচ্ছে না। নদী খনন হচ্ছে। তাও প্রায় দুই বছর আগে থেকে। বাঁধ দিয়ে নদী কাটা শেষ না হওয়ায় জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় বিল বরুণার ৪ হাজার বিঘা জমিতে এবার নিশ্চিত ফসল হবে না। আমরা চাই, দ্রুত নদী খননের কাজ শেষ হোক।’
ভবদহ গ্রামের কৃষক আবদুল মালেক বলেন, ‘বহুবার বিভিন্ন কায়দায় এখানে নদী খনন হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন পরে যা-তাই। নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিলগুলো অনেক নিচু হয়ে পড়েছে। সেখানে পলি ফেলে উঁচু না করলে নদী খনন কোনও কাজে আসবে না। আমাদের ভোগান্তিও কাটবে না।’
ডুমুরিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) অমিত কুমার বিশ্বাস জানান, আশ্রয়ণ প্রকল্পটি মূলত নদীর চরে তৈরি করা হয়েছিল। পরে সেটি খাস জমি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর সেখানে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। নদী খননকাজে মূলত কোনও বাড়িঘর ভাঙা হচ্ছে না। খননকৃত মাটি রাখার জায়গা না থাকায় নদীর দুই পাশে ফেলা হয়েছে। সেই মাটি গড়িয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের দিকে চলে আসছে। এতে কয়েকটি ঘরের পাশে মাটি জমেছে। কোনও ঘর ভাঙা হয়নি। মাটি পড়ে আশপাশ উঁচু হয়ে যাওয়ায় ভাঙার মতো দেখাচ্ছে। এসব মাটি অপসারণের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিলামের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মাটি সরিয়ে নিলে দেখা যাবে কোনও ঘরই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। আর এর সঙ্গে সরকারের খাল খননের কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই।’
ভবদহ সংশিষ্ট নদী খনন প্রকল্পের সমন্বয়কারী যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ ব্যানার্জী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইতিমধ্যে নদী খননের ৫৭ শতাংশ কা শেষ হয়েছে। বাকি কাজ ২০২৭ সালের জুন মাসে শেষ হবে। নদী থেকে মাটি তুলে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোর পাশে রাখায় মানুষের যাতায়াতে একটু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এখানে কোনও ঘর ভাঙা হয়নি। ফেসবুকে ছড়ানো ভিডিও সম্পূর্ণ ভুয়া।’