প্রেমের টানের রহস্যময় পরিণতি, চীনা প্রেমিকসহ আত্মগোপনে মেহেরপুরের তরুণী

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় থেকে প্রেম। সেই প্রেমের টানে গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে মেহেরপুরে আসেন এক চীনা নাগরিক। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে স্থানীয় এক তরুণীকে বিয়ে করেছেন বলে দাবি করেন তিনি। পরে স্ত্রীকে নিয়ে কয়েক মাস চীনে বসবাসের পর আবার গোপনে মেহেরপুরে ফিরে এসেছেন বলে জানান। তবে তাদের দেওয়া এসব তথ্য, বিয়ের কাগজপত্র, আইনি প্রক্রিয়া ও বিভিন্ন বক্তব্যে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। তাদের এসব তথ্য রহস্যে ঘেরা। পুরো বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন, আইনজীবী মহল ও স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চীনের নাগরিক ডং জে, যিনি বর্তমানে নিজের নাম মোহাম্মদ আলী বলে দাবি করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেহেরপুর পৌর এলাকার ঘোষপাড়ার বাসিন্দা শরিফ হোসেন ড্রাইভারের মেয়ে কেয়া খাতুনের সঙ্গে পরিচিত হন তিনি। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

কেয়া খাতুন জানান, প্রেমের টানে ডং জে মেহেরপুরে এসে প্রথমবার শহরের সেভেন সেন্স রেস্টুরেন্টে কেয়ার সঙ্গে দেখা করেন। এরপর ১৭ দিন শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকার জাহাঙ্গীর ইন আবাসিক হোটেলে অবস্থান করেন। পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে কেয়াকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তারা দুজন চীনে চলে যান এবং সেখানে প্রায় তিন মাস অবস্থান করার পর তিন দিন আগে আবার বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

তবে কেয়ার একাধিক প্রতিবেশী জানিয়েছেন, কেয়ার বিয়ে কিংবা চীনে যাওয়ার বিষয়টি তারা জানেন না। বিয়ের কথা শোনেননি। চীনে যাওয়ার কথাও না। বুধবার রাতে চীনা নাগরিককে নিয়ে কেয়া গোপনে বাবার বাড়িতে আসেন। বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে প্রতিবেশীরা ভিড় জমান। তখন ঘটনা জানাজানি হয়। তাদের বিয়ে নিয়ে শুরু হয় সমালোচনা। এ অবস্থায় সকালে বাড়ি থেকে অন্যত্র চলে যান তারা। খবর পেয়ে গণমাধ্যমকর্মী, পুলিশ কেয়ার বাড়িতে গেলে পরিবারের সদস্যরা জানান, কেয়া ও চীনা নাগরিক ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। পরে কেয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, ঢাকার পথেই আছেন তারা। 

সকালে বাড়ি গিয়ে কেয়াকে পাওয়া যায়নি। তার মা বলেছেন, ‌‘ছয় মাস আগে আমার মেয়ে চীনে গিয়েছিল। এরপর সেখান থেকে এসেছে গতকাল। সকালে স্বামীকে নিয়ে বাড়ি থেকে ঢাকায় চলে গেছে।’

এরপর স্থানীয় সোর্সের মাধ্যমে গণমাধ্যমকর্মী ও পুলিশ জানতে পারে, মেহেরপুর শহরের পুরাতন পোস্ট অফিসপাড়ার একটি পাঁচতলা ভবনে আছেন কেয়া। ওই বাসার মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আজই বাসাটি ভাড়া নিয়েছেন কেয়া। স্বামী নিয়ে থাকবেন বলেছেন। পরে বাসায় গিয়ে চীনের নাগরিক ও কেয়াকে পাওয়া যায়। এ সময় সাংবাদিকদের সামনে চীনের নাগরিক ও কেয়া দাবি করেন, ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর তারা বিয়ে করেছেন। বিয়ের প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র তাদের কাছে আছে। তবে বিয়ের কাবিননামা পুলিশকে দেখাতে পারেননি কেয়া। এ ছাড়া চীনা নাগরিকের ধর্ম ও নাম পরিবর্তনের এফিডেভিট, বিদেশিকে বিয়ের সার্টিফিকেট ও নোটারি পাবলিকের কাগজে মেহেরপুর জজ আদালতের আইনজীবী রূতসোভা মণ্ডলের নাম, সিলমোহর ও স্বাক্ষর আছে। যদিও এগুলোকে ভুয়া ও জালিয়াতি বলছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবী।

পাশাপাশি তাদের বক্তব্যের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্যের বেশ অসঙ্গতি রয়েছে। তা মা বলেছেন ছয় মাস আগে কেয়া বিদেশে গিয়েছিল। অথচ গত মার্চ মাসের মাঝামাঝিতে কেয়া পাসপোর্ট করেছেন। এখন প্রশ্ন হলো, ছয় মাস আগে কীভাবে পাসপোর্ট ছাড়া কেয়া বিদেশে গেছেন।

কাগজপত্রে উল্লেখ রয়েছে, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। সেখানে ডং জে বৌদ্ধ ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণের পর মোহাম্মদ আলী নাম গ্রহণ করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়। নিকাহনামায় দেনমোহর চার লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নথিপত্রের সঙ্গে এসব কাগজের কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

চীনা নাগরিকের ধর্ম-নাম পরিবর্তনের এফিডেভিট, বিদেশিকে বিয়ের সার্টিফিকেট ও নোটারি পাবলিকের কাগজে সিলমোহর-স্বাক্ষর থাকার বিষয়ে জানতে আইনজীবী রূতসোভা মণ্ডল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত তিন বছরেও কোনও চীনা বা কোনও বিদেশি নাগরিকের বিয়ের হলফনামা, ধর্ম-নাম পরিবর্তনের এফিডেভিট, নোটারি পাবলিকের কাগজে স্বাক্ষর কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনও নথি সম্পাদন করিনি। আমার নাম ও সিল জালিয়াতির মাধ্যমে তারা এগুলো করেছে বলে ধারণা করছি। এ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেবো।’

তাদের কাবিন হয়েছে কিনা জানতে চাইলে মেহেরপুর সদর উপজেলার নিকাহ রেজিস্ট্রার নান্নু বলেন, ‘বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বাংলাদেশি নাগরিকের বিয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস থেকে অনাপত্তিপত্র সংগ্রহ করতে হয়। অতঃপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন নিয়ে বিবাহ সম্পন্ন করতে হয়। কিন্তু কেয়া এবং ওই বিদেশি নাগরিক চীনা দূতাবাসের কোনও বৈধ অনাপত্তিপত্র দেখাতে পারেননি। আমাদের এখানে তাদের কাবিন হয়নি। ফলে কীভাবে বিয়ের নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।’

এদিকে কেয়া এবং চীনা নাগরিক দাবি করেছেন, তারা মেহেরপুরে আসার আগে সদর থানায় বিষয়টি জানিয়েছেন। তবে সদর থানার ওসি জানিয়েছেন, এ ধরনের কোনও আগাম তথ্য থানায় জানানো হয়নি।

মেহেরপুর জেলা পুলিশের মিডিয়া ফোকাল পারসন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিনুর রহমান খান বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করতে হবে। তদন্তের আগে এ বিষয়ে কিছুই বলতে পারছি না।’

বাংলাদেশ তথ্য ও মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের মেহেরপুর জেলা শাখার সভাপতি রফিকুল আলম বলেন, ‘বিদেশি নাগরিকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন, অভিবাসন বিধি এবং বিয়ের নিবন্ধনের সব আইনি শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কিনা, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। যদি কোনও নথি জালিয়াতি, তথ্য গোপন বা প্রতারণার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’