নারী নির্যাতন মামলায় জেল খেটে আবার চাকরিতে সহযোগী অধ্যাপক, নানা প্রশ্ন

নারী নির্যাতনের মামলায় কারাবরণ করেছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সভাপতি সহযোগী অধ্যাপক ড. সঞ্জয় কুমার সরকার। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির মাধ্যমে মুক্তি লাভ করেন। তবে কারাগার থেকে বের হওয়ার পর তার স্বপদে পুনঃযোগদান, প্রশাসনিক অনুমোদন এবং হাজতবাসকালীন চাকরির অবস্থান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই তিনি বিভাগীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন, ক্লাস-পরীক্ষা গ্রহণসহ স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে তার অধ্যাপক পদে পদোন্নতির আবেদনও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের Employees' Efficiency and Discipline Rules-এর ১৫(ক) ও ১৫(খ) বিধান অনুযায়ী কোনো শিক্ষক ফৌজদারি মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে গেলে তাকে সাময়িক বরখাস্তে রাখার বিধান রয়েছে। জামিনে মুক্তির পর দায়িত্বে ফিরতে হলে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে পুনরায় যোগদান করতে হয়। কিন্তু ড. সঞ্জয় কুমার সরকারের ক্ষেত্রে এ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি-না, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনও তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ড. সঞ্জয় কুমার সরকার বর্তমানে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য আবেদন করেছেন। পদোন্নতির আগে তার সার্ভিস রেকর্ড, হাজতবাসকালীন প্রশাসনিক অবস্থা, পুনঃযোগদানের বৈধতা এবং শৃঙ্খলা বিধি অনুসরণের বিষয়গুলো যথাযথভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি-না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন শিক্ষকরা।

জানা যায়, ২০১৬ সালে চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ গ্রহণের অভিযোগে ড. সঞ্জয় কুমার সরকার ও অপর এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে কুষ্টিয়ার আদালতে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে মামলা দায়ের হয়। একই ঘটনায় অভিযোগকারীর ছেলেকে (যিনি ওই বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন) বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার এবং ক্ষতির হুমকি দেওয়া হয়৷ এছাড়া ২০১৮ সালে এক ছাত্রী তার বিরুদ্ধে মানসিক নির্যাতন ও যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন। যা তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়।

অন্যদিকে, নাটোর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে তার নিজ স্ত্রীর দায়ের করা একটি যৌতুক নির্যাতন মামলায়, ২০০০-এর ১১(গ) ধারায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেন এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। পরবর্তীতে তিনি গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকেন এবং পরে আদালতের আদেশে জামিন লাভ করেন।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, অতীতে বিভিন্ন অভিযোগ ও গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও তার বিরুদ্ধে কার্যকর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তার দাবি, সে সময় বঙ্গবন্ধু পরিষদ ও তৎকালীন আওয়ামীপন্থী শিক্ষক সংগঠন 'শাপলা ফোরাম'-এর সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অভিযোগগুলোর যথাযথ নিষ্পত্তি হয়নি।

এদিকে বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের এক সিনিয়র আইনজীবী বলেন, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত কোনও ব্যক্তি জেল-হাজতে থাকলে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার বিধান রয়েছে। খালাস বা আইনগতভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে পুনরায় যোগদান করতে হয়।

অভিযোগের বিষয়ে ড. সঞ্জয় কুমার সরকার বলেন, বিষয়টি আদালতেই নিষ্পত্তি হয়েছে। আমি বিভাগে লিখিতভাবে অন্য একজনকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম এবং তৎকালীন ডিন অধ্যাপক ড. সেলিনা নাসরিনকেও জানিয়েছিলাম। তখন ২৪ পরবর্তী পরিস্থিতিতে উপাচার্যের পদ শূন্য ছিল এবং একজন ডিন দায়িত্বে ছিলেন। সে কারণে প্রশাসনকে আলাদাভাবে জানানো হয়নি। আমি মনে করেছিলাম আদালতই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবহিত করবেন। মাত্র চার-পাঁচ দিন জেল-হাজতে ছিলাম এবং পরে মামলা ডিসমিস হওয়ায় প্রশাসনকে আর জানানো হয়নি।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মনজুরুল ইসলাম বলেন, ড. সঞ্জয় কুমার সরকারের বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে কিংবা দাপ্তরিকভাবে আমি অবগত নই। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তা উপাচার্যের কাছে পাঠানো হয়। এরপর প্রয়োজন হলে তদন্ত কমিটি গঠন বা অন্যান্য প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরুর আগে আগাম কোনও মন্তব্য বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা সম্পর্কে কিছু বলা সম্ভব নয়। তৎকালীন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানতেন কি-না বা কোনও পদক্ষেপ নিয়েছিলেন কি-না, সে বিষয়ে আমার কাছে কোনো নথি নেই।