হলের ছাত্রীদের ব্যক্তিগত ছবি তুলে প্রেমিককে পাঠাতেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) জুলাই-৩৬ হলের এক ছাত্রীর বিরুদ্ধে সহপাঠী ও রুমমেটদের ব্যক্তিগত ছবি তাদের অনুমতি ছাড়া তার প্রেমিকের কাছে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তুবাউল জান্নাত ঐশীর বিরুদ্ধে।

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রাতে বিষয়টি হলের আবাসিক ছাত্রীদের মধ্যে প্রকাশ্যে এলে তারা তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন। এ ঘটনার জেরে রাতভর হলজুড়ে উত্তেজনা বিরাজ করে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত নিজেও কিছু কথা স্বীকার করায় তাকে প্রাথমিকভাবে হল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা।

এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হল প্রশাসন। হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. এ কে এম শামছুল হক ছিদ্দিকী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. আরিফা আক্তারকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. খাইরুল ইসলাম এবং সদস্যসচিব করা হয়েছে দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুজ্জামানকে।

এ ছাড়া হলের প্রভোস্ট স্বাক্ষরিত পৃথক আরেকটি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জুলাই-৩৬ হলের সব আবাসিক ছাত্রীকে অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে, অভিযুক্ত ছাত্রীর বিরুদ্ধে কারও কোনও অভিযোগ থাকলে তা আগামী রবিবার (৯ আগস্ট) অফিস সময়ের মধ্যে প্রভোস্ট বরাবর লিখিতভাবে জমা দিতে হবে।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও রুমমেটদের অভিযোগ, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী হলে অবস্থানরত কয়েকজন ছাত্রীর ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি তাদের অনুমতি ছাড়াই আবিদ নামে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী এক ব্যক্তির কাছে পাঠাতেন। সম্প্রতি ওই ব্যক্তির সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের অবনতি হলে ছবিগুলোর কিছু অংশ ভুক্তভোগীদের কাছে পাঠান আবিদ।

একাধিক সূত্রের দাবি, আবিদ নামের ওই ব্যক্তির সঙ্গে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্কের সময়ই তার কাছে বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও পাঠানো হতো। পরে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটলে ওই ব্যক্তি সেগুলোর কিছু অংশ হলের অন্য শিক্ষার্থীর কাছে পাঠিয়ে দেন।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা বলেন, এ পর্যন্ত আমরা কমপক্ষে ১০ শিক্ষার্থীর ছবি শনাক্ত করেছি। কিছু স্ক্রিনশটও সংরক্ষণ করেছি। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকেই জুলাই-৩৬ হলের ছাত্রীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। এখন অনেক শিক্ষার্থী হলের ভেতরে নিজেদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন।

অভিযুক্ত শিক্ষার্থী তুবাউল জান্নাত ঐশী বলেন, আমি পরিস্থিতির শিকার হয়ে এসব ছবি তাকে পাঠিয়েছি। সে আমাকে একের পর এক ভিডিও কল দিতো। আমি কোন পরিস্থিতিতে আছি, সেটা বোঝাতে রুমমেটদের ছবি পাঠাতাম। এ ছাড়া তারাও (রুমমেট) ওই ছেলেকে চিনতো। এমনকি সে দেশে এলে তারা তার সঙ্গে দেখা করে ট্রিটও নিয়েছে। এক সপ্তাহ আগে সে আমাকে বিয়ের জন্য চাপ দিলে আমি পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়েতে রাজি হইনি। তাই সে এখন আমার বিভিন্ন সময়ে পাঠানো ছবিগুলো নিয়ে প্রত্যেককে ইনবক্স করে এসব শুরু করেছে। আমি খুব বাজেভাবে ফেঁসে গেছি। এখন আমার সরি বলা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।

অভিযুক্ত ঐশীর প্রেমিক ও লন্ডনপ্রবাসী আবিদ বলেন, সে যখন অন্য মেয়েদের ব্যক্তিগত ছবি আমাকে পাঠাতো, তখন আমি তাকে বারবার নিষেধ করতাম। কিন্তু সে বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে উল্টো হাসাহাসি করতো। আমার কাছে মনে হতো, এসব করে সে এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পেতো। কোনও সুস্থ মানসিকতার মানুষ এমন আচরণ করতে পারে না। তার জন্য আমি অনেক অর্থ ব্যয় করেছি। শুধু তার কথা ভেবেই দুই মাস আগে লন্ডন থেকে দেশে এসে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও গিয়েছিলাম। আশা করেছিলাম, সময়ের সঙ্গে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এখন তার প্রকৃত আচরণ সবার সামনে এসেছে। সে আমার জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আরিফা আক্তার বলেন, আমি অলরেডি কাজ শুরু করেছি। আগামীকাল কমিটির সদস্যদের নিয়ে বসবো। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই এ তদন্তের রিপোর্ট দেবো, ইনশাআল্লাহ।

এ বিষয়ে জুলাই-৩৬ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. এ কে এম শামছুল হক ছিদ্দিকী বলেন, আমি ঘটনাটি গতকাল মধ্যরাতে শুনেছি। সকালে এসে পৃথক সাতটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা নিশ্চিত হওয়ায় তাকে সাময়িক বহিষ্কার করা হচ্ছে। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তাদের প্রতিবেদনের আলোকে পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। অভিযুক্ত নিজেও কিছুটা স্বীকার করেছে। তাই তাকে প্রাথমিকভাবে হল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। এ ছাড়া একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।