চট্টগ্রামে একের পর এক আলোচিত হত্যাকাণ্ড ও চাঁদাবাজিতে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক ভারী অস্ত্রের সন্ধান এখনও পায়নি পুলিশ। শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন এবং যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরী হত্যা মামলার আসামি ইলিয়াস ওরফে ধামা ইলিয়াসকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও একে-৪৭, চাইনিজ রাইফেল, শটগান ও একাধিক পিস্তলের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। গ্রেফতারের আগে ডেভিড ইমন যেসব অস্ত্র হাতে নিয়ে ছবি দিয়েছিলেন সেগুলো এআই দিয়ে তৈরি করা বলে দাবি করছেন। তবে তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই করে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।
জানা গেছে, গত ১৩ জুন দুপুরে রাউজানের পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে ছয় সন্ত্রাসী। সিসিটিভি ফুটেজে হামলাকারীদের দুটি শটগান ও চারটি পিস্তল ব্যবহার করতে দেখা যায়। ফুটেজে ধামা ইলিয়াসকে শটগান হাতে গুলি চালাতেও দেখা গেলেও গ্রেফতারের পর সেই অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।
এর আগে নগরের চকবাজার থানার চন্দনপুরায় শিল্পপতি মজিবুর রহমানের বাড়িতে কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে ব্যর্থ হয়ে চলতি বছরের ২ জানুয়ারি ও ২৮ ফেব্রুয়ারি দুই দফা হামলা চালায় সাজ্জাদ গ্রুপ। ওই হামলাগুলোতেও একে-৪৭, চাইনিজ রাইফেল, শটগান ও পিস্তল ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
শুধু তাই নয়, গত বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন আলোচিত সন্ত্রাসী আলী আকবর ওরফে ঢাকাইয়া আকবর। পরে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মৃত্যুর আগে হত্যাকাণ্ডে ডেভিড ইমনের নাম উল্লেখ করেছিলেন বলে স্বজনরা জানিয়েছেন।
এ ছাড়া গত বছরের ২৯ মার্চ নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোডে একটি প্রাইভেটকার লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণে দুই জন নিহত হন। তবে প্রাণে বেঁচে যান সরোয়ার হোসেন। পরে মামলায় গ্রেফতার এক আসামি আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে জানান, এলাকায় ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, বড় সাজ্জাদকে ধরিয়ে দেওয়াসহ কয়েকটি কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে সরোয়ারকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল।
পরে গত বছরের ৫ নভেম্বর বায়েজিদ বোস্তামী থানার চালিতাতলী এলাকায় বিএনপির সংসদ সদস্য প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর গণসংযোগ চলাকালে সরোয়ার হোসেনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহতের স্বজনরা ওই হত্যাকাণ্ডেও ডেভিড ইমন ও রায়হানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেন।
ডেভিড ইমনের হাতে চাইনিজ রাইফেলসহ ভারী অস্ত্রের ছবি একাধিকবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। তবে গত ২৯ জুলাই যশোরের কোতোয়ালি থানার ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে গ্রেফতারের পর তার দেওয়া তথ্যে ফটিকছড়িতে অভিযান পরিচালনা করে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশীয় এলজি এবং অন্য দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। অভিযানে এখন পর্যন্ত কোনও ভারী অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি।
পুলিশের ধারণা, তার নিয়ন্ত্রণে ২০টির মতো পিস্তল, চাইনিজ রাইফেল ও একে-৪৭ রাইফেল রয়েছে।
গত ২ আগস্ট আদালত ডেভিড ইমনের দুই মামলায় পাঁচ দিন করে মোট ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। একই দিন ধামা ইলিয়াসের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। পরে তাদের মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, তারা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। তবে মাসুদুল হত্যা মামলায় প্রকাশ্যে ব্যবহৃত দুটি শটগান ও পিস্তলগুলোর অবস্থান এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ ঢাকার বসুন্ধরা সিটি শপিংমল থেকে ছোট সাজ্জাদকে গ্রেফতার করা হয়। তিন দফায় ১৪ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হলেও তার কাছ থেকেও একটি পিস্তল ছাড়া অন্য কোনও অত্যাধুনিক অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ডেভিড ইমন ও ধামা ইলিয়াসকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাদের কাছ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। সেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি।’
ভারী অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তাদের কাছে থাকা অস্ত্র উদ্ধার নিয়েও আমরা কাজ করছি। তদন্তাধীন বিষয় হওয়ায় এর বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়।’
তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ডেভিড ইমন জিজ্ঞাসাবাদে একেক সময় একেক ধরনের তথ্য দিচ্ছেন। তিনি দাবি করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া অস্ত্রের ছবিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি। একই সঙ্গে তিনি ও ধামা ইলিয়াস দাবি করেছেন, গ্রুপের ব্যবহৃত একে-৪৭, চাইনিজ রাইফেল ও শটগান বর্তমানে রায়হানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মাসুদুলকে হত্যার পর অস্ত্রগুলো রায়হান সরিয়ে নেয় বলেও তারা জানিয়েছেন। পুলিশ এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ডেভিড ইমন, ধামা ইলিয়াস ও ছোট সাজ্জাদ ভারতে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের অনুসারী। গত দুই থেকে আড়াই বছরে চাঁদাবাজি, গুলিবর্ষণ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। বিশেষ করে বায়েজিদ বোস্তামী, চান্দগাঁও, ষোলশহর, হাটহাজারী ও রাউজান এলাকায় তাদের তৎপরতা ছিল বেশি। চাঁদা না পেলে নির্মাণাধীন ভবন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, গুলিবর্ষণ ও ভাঙচুর চালানোর পাশাপাশি তাদের বিশাল কিশোর গ্যাংও সক্রিয় ছিল।
গত এক মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে সাজ্জাদ গ্রুপের ৩৭ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা বর্তমানে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন। এর মধ্যে গ্রেফতার ডেভিড ইমন আটটি হত্যা মামলাসহ ১৪টি মামলার আসামি, ধামা ইলিয়াস পাঁচটি হত্যা মামলাসহ ১৮টি মামলার এবং ছোট সাজ্জাদ নয়টি হত্যা মামলাসহ ১৫টি মামলার আসামি বলে পুলিশ জানিয়েছে।









