১২ ঘণ্টায় ৯ বার লোডশেডিং, বিদ্যুৎ এলেও ২০ মিনিটের বেশি থাকে না

চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহে ১১৬ মেগাওয়াট ঘাটতি। এই ঘাটতিতেই খুলনা অঞ্চলে বেড়েছে লোডশেডিং। দিনের পাশাপাশি রাতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন সাধারণ মানুষজন। বাসাবাড়ির পাশাপাশি মিল-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষার্থী ও অনলাইনভিত্তিক পেশাজীবীদের কাজও ব্যাহত হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের কারণে কোথাও কোথাও পানির সংকটও দেখা দিয়েছে। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ভোগান্তি বেড়েছে সবচেয়ে বেশি।

পাশাপাশি শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি লোকসানের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে বিদ্যুৎ ঘাটতির প্রভাব শুধু জনদুর্ভোগেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, তৈরি হচ্ছে অর্থনৈতিক উদ্বেগও।

গ্রাহকরা বলছেন, দিনে-রাতে কতবার বিদ্যুৎ যায়-আসে, তার কোনও হিসাব নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং চলায় ভ্যাপসা গরমে ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হচ্ছে। শহরাঞ্চলেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে।

ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) উপসহকারী প্রকৌশলী মো. রাকিব বলেন, ‌‘রবিবার (৩০ আগস্ট) সকাল ১০টায় খুলনা জোনে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৫২২ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৪০৬ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ১১৬ মেগাওয়াট। একই সময়ে বরিশাল জোনে ১৫৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১২৫ মেগাওয়াট। দুই জোনে মোট ৬৭৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৫৩১ মেগাওয়াট। মোট ঘাটতি ছিল ১৪৬ মেগাওয়াট।’

ওজোপাডিকোর তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে খুলনায় ৪২ মেগাওয়াট, বাগেরহাটে ৪, নড়াইলে ২, মাগুরায় ৮, কুষ্টিয়ায় ১০, ঝিনাইদহে ১৩, চুয়াডাঙ্গায় ১, ফরিদপুরে ৮, রাজবাড়ীতে ১৪, মাদারীপুরে ৬, শরীয়তপুরে ২ এবং গোপালগঞ্জে ৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। বরিশাল বিভাগের মধ্যে বরিশালে ১৯, ঝালকাঠিতে ৩, পিরোজপুরে ৩, বরগুনায় ২ এবং ভোলায় ৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল।

ওজোপাডিকোর তথ্যমতে, ৩০ আগস্ট দুপুর ১টায় দুই জোনে মোট লোডশেডিং ছিল ২৩৯ মেগাওয়াট। ওই সময় ৮০৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৫৬৭ মেগাওয়াট। পিক আওয়ারে খুলনা অঞ্চলে ৬২৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৪৫৬ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ১৬৯ মেগাওয়াটে। অন্যদিকে বরিশাল অঞ্চলে ১৮১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১১১ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ৭০ মেগাওয়াট।

পিক আওয়ারে খুলনা জেলায় ৭০ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। বরিশালে ৪৬, কুষ্টিয়ায় ২৩, রাজবাড়ীতে ১৭, ঝিনাইদহে ১৪, মাগুরায় ৮, ফরিদপুরে ৮, গোপালগঞ্জে ৭, চুয়াডাঙ্গা ও মাদারীপুরে ৬, পিরোজপুর ও পটুয়াখালীতে ৫, বরগুনা ও ঝালকাঠিতে ৪, নড়াইল, শরীয়তপুর ও ভোলায় ৩, মেহেরপুর ও বোরহানউদ্দিনে ২ এবং বাগেরহাট, ভেড়ামারা ও চরফ্যাশনে ১ মেগাওয়াট করে লোডশেডিং ছিল।

ওজোপাডিকোর তথ্য অনুযায়ী, ৩১ আগস্ট দুপুর ১টায় ১৭৯ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। ৭৫৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৫৭৬ মেগাওয়াট। খুলনা অঞ্চলের ৫৭৩ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৪৫০ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং হয় ১২৩ মেগাওয়াটে। 

অপরদিকে, এদিন বরিশাল অঞ্চলে ১৮২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল মাত্র ১২৬ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ৫৬ মেগাওয়াট। খুলনা জেলায় ৪৮ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। বরিশাল জেলায় লোডশেডিং ছিল ২৮ মেগাওয়াট। এছাড়া কুষ্টিয়ায় ২২ মেগাওয়াট, রাজবাড়ীতে ১৪ মেগাওয়াট এবং ঝিনাইদহে ৯ মেগাওয়াট, মাগুরায় ৮ মেগাওয়াট, ফরিদপুরে ৬ মেগাওয়াট, গোপালগঞ্জে ৫ মেগাওয়াট, চুয়াডাঙ্গায় ২ মেগাওয়াট, বাগেরহাটে ৬ মেগাওয়াট, পিরোজপুরে ৫ মেগাওয়াট, পটুয়াখালীতে ৭ মেগাওয়াট, বরগুনায় ৫ মেগাওয়াট, ঝালকাঠিতে ৫ মেগাওয়াট, শরীয়তপুরে ৩ মেগাওয়াট, ভোলায় ৩ মেগাওয়াট, বোরহানউদ্দিনে ২ মেগাওয়াট, চরফ্যাশনে ১ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল।

খুলনা মহানগরীর লবণচরা এলাকার বাসিন্দা মো. শাহরিয়ার রাব্বি বলেন, ‘শনিবার বেলা আড়াইটা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত অন্তত নয়বার লোডশেডিং হয়েছে। প্রতিবার এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। বিদ্যুৎ এলেও সর্বোচ্চ ২০ মিনিটের মতো থাকছে। ভয়াবহ একটা অবস্থা তৈরি হয়েছে। অসুস্থ হয়ে পড়ছি।’ 

আমি ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত জানিয়ে বলেন, ‘অনলাইনে কাজ করতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। লোডশেডিংয়ের কারণে সময়মতো ক্লায়েন্টদের কাজ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে কাজের ক্ষতির পাশাপাশি ক্লায়েন্ট হারানোর আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।’

এ ব্যাপারে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) খুলনা জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষের ভোগান্তির পাশাপাশি মিল-কারখানার উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে এক ধরনের ইকোনমিক টর্চার শুরু হয়েছে। বিশ্ব এখন সৌরবিদ্যুতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশকেও দ্রুত বিকল্প বিদ্যুতের দিকে যেতে হবে। যারা সৌরবিদ্যুৎ আমদানি করবে, তাদের প্রণোদনা দিয়ে এ উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।’

জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে নতুন করে নির্মাণ করা ছয়তলার বেশি ভবনে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানান তিনি। পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণেরও দাবি করেন।

কুদরত-ই-খুদা বলেন, ‘একটি ইজিবাইক চার্জ দিতে ১৩ থেকে ১৪ ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। খুলনায় প্রায় ৩০ হাজার ইজিবাইক ও ১৫ হাজার অটোরিকশার জন্য দৈনিক প্রায় ৫ লাখ ৮৫ হাজার ইউনিট বা ৫৮ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। বিদ্যুতের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। অন্যথায় জনদুর্ভোগের পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে।’