গ্যাস সংকটের পাশাপাশি তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। লোডশেডিং নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কুড়িগ্রামের একটি সরকারি স্কুলের এক শিক্ষক ফেসবুকে লিখেছেন, ‘এই এক বিদ্যুতেই আপনাদের বারোটা বাজাবে বলে মনে হচ্ছে। যতসব অযোগ্য লোকদের সব জায়গায় দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে। লোডশেডিংয়ের কারণে বাচ্চা নিয়ে রাতের পর রাত জাগা আর কোনোভাবেই সহ্য হচ্ছে না। পাগল হয়ে যাচ্ছি।’
শুধু এই শিক্ষক নন, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে কুড়িগ্রামে সব শ্রেণিপেশার মানুষের মাঝে ক্ষোভ ও বিরক্তি বেড়েছে। বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল শিল্পকারখানায় উৎপাদন মুখ থুবড়ে পড়েছে। খামারিরা পড়েছেন বিপাকে। গরমে গরু ও মুরগির হিটস্ট্রোকের আশঙ্কা করছেন খামারিরা। বৃষ্টির অভাবে শুকিয়ে যাওয়া আমন ক্ষেতে সেচ দিতে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকরা।
‘বিদ্যুৎ নাই। পরিস্থিতি একবারে খারাপ। খামার নিয়া খুব টেনশনে আছি। গরমে গরু সমানে হাপাইতেছে। নেলপা (লালা) ফেলাইতেছে। গোসল ঠিকমতো দিতে পারতেছি না, ফ্যানও চালাইতে পারতেছি না। পরিস্থিতি খুব খারাপ। সারাদিনে কারেন্ট এক ঘণ্টাও পাই না। রাইতে অবস্থা আরও খারাপ।’ লোডশেডিংয়ে গরুর খামার নিয়ে বিপাকে পড়া খামারি আনিছুর রহমান এভাবে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন।
আনিছুরের বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুরের ধামশ্রেণি ইউনিয়নের সুরির ডারা গ্রামে। তার খামারে চারটি দুগ্ধবতী গাভিসহ ফ্রিজিয়ান ও ক্রোস জাতের মোট ১১টি গরু রয়েছে। চলমান লোডশেডিংয়ে খামারের গরুর স্বাস্থ্য নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছেন এই খামারি।
আনিছুর বলেন, ‘গরমে গরু খাইতে পারতেছে না। দিন-রাত হাপাইতেছে। গাভিগুলার দুধ কমে গেছে। খেতে না পারলে দুধ কেমন করি হবে। যে গরম পড়ছে, কখন হিটস্ট্রোক হয় সেই চিন্তায় স্থির থাকতে পারি না।’
শহরের চেয়ে গ্রামে লোডশেডিং চরম আকার ধারণ করেছে। দিনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাতেও সমান তালে লোডশেডিংয়ের ফলে অনেকে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। উলিপুরের বাসিন্দা ও উদ্যোক্তা মারুফ আহমেদ লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে নিজের ফেসবুকে লিখেছেন, ‘তীব্র গরমে সারাদিন ছোটাছুটির পর রাতে লোডশেডিং। ৩-৪ ঘণ্টাও ঠিকভাবে ঘুমাতে পারিনা। এদিকে এমন শারীরিক অবস্থা, একদিন না ঘুমাতে পারলে পরেরদিন প্রেশার হাই থাকে।’
শহর-গ্রামে লোডশেডিং বৈষম্যে বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে মারুফ বলেন, ‘শহরে থাকে ওদের....। তাই গ্রামের বরাদ্দ কেটে শহরে দেয়। ১৫ মিনিটও কারেন্ট থাকতেছে না গ্রামে।’
লোডশেডিংয়ে স্থবির হয়ে পড়েছে উৎপাদন। বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মালিকরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। দিন গেলে শ্রমিকদের মজুরি দিলেও বিদ্যুতের অভাবে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন হচ্ছে না।
কুড়িগ্রাম শহরের পাওয়ার হাউজ পাড়া এলাকার ওয়ার্কশপ ব্যবসায়ী সুমন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সকাল ১০টায় দোকান খুলছি। এখন বাজে দুপুর ১২টা। দুই ঘণ্টায় দুবার লোডশেডিং। সারাদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং চলে। সবমিলিয়ে ৩-৪ ঘণ্টা কারেন্ট পাই। কীভাবে ব্যবসা করি। দিন গেলে লেবারদের টাকা দেওয়া লাগে। কাজের অর্ডার নিয়া সময়মতো ডেলিভারি দিতে পারছি না।’
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, কুড়িগ্রামে পল্লী বিদ্যুতের আওতায় প্রায় ৫ লাখ এবং নর্দান ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির আওতায় ৩২ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। জেলায় প্রায় ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদার বিপরীতে সর্বোচ্চ ৪৩ মেগাওয়াট বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে। এতে করে লোডশেডিং দিতে বাধ্য হচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
নেসকো কুড়িগ্রাম অফিস জানায়, তাদের আওতায় বিদ্যুতের চাহিদা দিনে সাড়ে ১১ মেগাওয়াট থেকে রাতে ১৩ মেগাওয়াট পর্যন্ত উঠছে। কিন্তু চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় অর্ধেক। ফলে ঘাটতি পূরণে তারা লোডশেডিং দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
নেসকো কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শনিবার দুপুরে সাড়ে ১১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল ৭ দশমিক ৬ মেগাওয়াট। কখনও কখনও ঢাকা থেকে স্ক্যাডা পরিচালনার কারণে বিদ্যুৎ থাকছে না। ঘাটতির কারণে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে আমাদের।’
গ্রাহকদের ক্ষোভ আর অভিযোগের কথা স্বীকার করে কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার শামীম পারভেজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ নিয়ে খুব খারাপ অবস্থায় আছি। গ্রাহকরা ক্ষোভ জানাচ্ছেন। কিন্তু কুড়িগ্রামে বরাদ্দ একবারে কম। এর মধ্যে স্ক্যাডা অপারেশন করে ঢাকা থেকে গ্রিড অফ করে দেওয়া হয়। দিনে কিছুটা ভালো থাকলেও রাতে জেলার সব জায়গায় একই অবস্থা থাকে।’ তবে কবে নাগাদ লোডশেডিং থেকে গ্রাহকদের মুক্তি মিলবে সে বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ কোনও সদুত্তর দিতে পারেনি।









