সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের মধ্যে চারটি জলদস্যু বাহিনীর ৫২ সদস্য আত্মসমর্পণ করেছেন। র্যাব-৬-এর অভিযানের মুখে তারা অপরাধের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করে সোমবার আত্মসমর্পণ করেন। মঙ্গলবার বিষয়টি জানিয়েছেন র্যাব-৬-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিস্তার আহমেদ।
আত্মসমর্পণকারী ৫২ জনের মধ্যে বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ১৬ জন, আনারুল বাহিনীর ১৩ জন, আফজাল ওরফে দুলাভাই বাহিনীর ১৫ জন এবং আফতাব বাহিনীর আট জন রয়েছেন।
প্রসঙ্গত, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে র্যাব ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে ৩২টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। এরপর ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সুন্দরবনকে আনুষ্ঠানিকভাবে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নানা কারণে পরবর্তীতে কিছু দস্যু বাহিনী পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে।
র্যাব-৬-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিস্তার আহমেদ বলেন, ‘সোমবার একযোগে চারটি জলদস্যু বাহিনীর ৫২ সদস্যের আত্মসমর্পণ সুন্দরবনের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এর ফলে এসব দস্যু বাহিনীর সাংগঠনিক সক্ষমতা ও অপরাধমূলক তৎপরতা কমার পাশাপাশি সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালসহ বনজীবীদের নিরাপদে জীবিকা নির্বাহের পরিবেশ আরও সুদৃঢ় হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘সুন্দরবনকে জলদস্যু ও বনদস্যুদের অপতৎপরতা থেকে মুক্ত রাখা এবং বননির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা র্যাবের অন্যতম অগ্রাধিকার। সুন্দরবনে জলদস্যুতা, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়সহ সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রতিরোধে র্যাব-৬-এর অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত থাকবে।’
র্যাব-৬-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তিদের বিষয়ে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পর যথাসময়ে আদালতে সোপর্দ করা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান এবং সরকারের পুনর্বাসন উদ্যোগের ফলে এর আগেও সুন্দরবনের বিভিন্ন দস্যু বাহিনীর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সদস্য আত্মসমর্পণ করেছিলেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন দস্যুচক্রের তৎপরতা এবং আগে আত্মসমর্পণ করা কয়েকজনের পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার তথ্য পাওয়া যায়। পাশাপাশি জেলে ও বনজীবীদের অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি এবং অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঘটনাও সামনে আসে।
এ পরিস্থিতিতে সুন্দরবনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং জলদস্যু ও বনদস্যুদের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে র্যাব-৬ গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান জোরদার করে। র্যাবের ধারাবাহিক তৎপরতা, বনের প্রতিকূল পরিবেশ এবং অপরাধজীবনের অনিশ্চয়তার মধ্যে বিভিন্ন দস্যু বাহিনীর সদস্যরা অপরাধের পথ পরিহার করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
এদিকে, বন্যপ্রাণীর প্রজনন ও বিচরণ নির্বিঘ্ন রাখা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস সুন্দরবনে পর্যটক ও বনজীবীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ সেপ্টেম্বর থেকে প্রযোজ্য বিধিবিধান ও অনুমতি সাপেক্ষে সুন্দরবন আবার পর্যটক ও বনজীবীদের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে।
সুন্দরবন উন্মুক্ত হওয়ার ঠিক আগের দিন চারটি জলদস্যু বাহিনীর ৫২ সদস্যের আত্মসমর্পণকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এতে বনজীবীদের নিরাপদে জীবিকা নির্বাহ, পর্যটকদের নিরাপদ চলাচল এবং সুন্দরবনকেন্দ্রিক স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে সুন্দরবনকেন্দ্রিক সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে থাকলে অবৈধভাবে কাঠ ও অন্যান্য বনজ সম্পদ আহরণ, বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচারসহ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর অপরাধ প্রতিরোধেও তা সহায়ক হবে।
র্যাব-৬ জানিয়েছে, সুন্দরবনের নিরাপত্তা, বনজীবীদের জীবন ও জীবিকার সুরক্ষা এবং দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে তাদের অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
র্যাব-৬-এর অধিনায়ক নিস্তার আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালরা জলদস্যুদের অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির কারণে চরম ঝুঁকির মধ্যে ছিলেন। জলদস্যুদের বিরুদ্ধে র্যাবের ধারাবাহিক অভিযান এবং গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় চার বাহিনীর ৫২ সদস্য আত্মসমর্পণ করেছেন। বুধবার এ বিষয়ে প্রেস ব্রিফিং করে বিস্তারিত জানানো হবে।
তিনি বলেন, বন্যপ্রাণীর প্রজনন ও বিচরণ নির্বিঘ্ন রাখতে তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষে ১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবন পর্যটক ও বনজীবীদের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত হচ্ছে। এর ঠিক আগের দিন বিপুলসংখ্যক জলদস্যুর অস্ত্র ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার ঘোষণা সুন্দরবনের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ।