গ্রাহকের শত কোটি টাকা নিয়ে উধাও, জেল থেকে পালানোর দুই বছর পর ধরলো পুলিশ

গ্রাহকদের শত কোটি টাকা আত্মসাৎ ও জেল থেকে পালানো বিশ্বাস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান আনিসকে গ্রেফতার করেছে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানা পুলিশ। তার বিরুদ্ধে বিশ্বাস ফাউন্ডেশন নামে একটি এনজিওর মাধ্যমে গ্রাহকদের শত কোটি টাকা আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগে ১২৪টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে একাধিক মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি তিনি।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকালে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এর আগে বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাত ১২টার দিকে ঢাকার বিমানবন্দর থানা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। 

কুমারখালী থানা পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তি ও র‌্যাবের সহায়তায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে।

২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেফতার করেছিল কুমারখালী থানা পুলিশ। পরে কুষ্টিয়া কারাগারে পাঠানো হয়। কিছু দিন পর জেলখানা থেকে পালিয়ে যান তিনি।

কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন বলেন, ‌‘মানুষকে দ্বিগুণ লাভের প্রলোভন দেখিয়ে সুকৌশলে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন আনিসুর। আদালতে মামলার পর তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট জেল থেকে পালিয়ে যান। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাকে ফের গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’

আনিসুর রহমান কুমারখালীর নন্দলালপুর ইউনিয়নের সদরপুর গ্রামের মৃত ইব্রাহিম বিশ্বাসের ছেলে। ২০০৬ সালে আলাউদ্দিন নগর এলাকায় ‘বিশ্বাস সঞ্চয় ঋণদান ও সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে একটি এনজিও চালু করেন।

পুলিশ, এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক বছরের মধ্যে কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, পাবনা, ঝিনাইদহসহ আশপাশের জেলায় কয়েকশত শাখা খোলেন আনিসুর রহমান। দ্বিগুণ টাকা ফেরত দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে হাজার হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে বিভিন্ন মেয়াদি ডিপিএসের নামে মোটা অঙ্কের টাকা জমা নেন। একপর্যায়ে কয়েকশত কোটি টাকা জমা হলে তা দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে জমি, বাড়ি, গাড়িসহ সম্পদের পাহাড় গড়েন। 

২০২৩ সালের নভেম্বরে গ্রাহকরা টাকার জন্য চাপ দিলে অফিসে তালা ঝুলিয়ে লাপাত্তা হয়ে যান তিনি। ২০২৪ সালের শুরুতে কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন আদালতে আনিছের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাত ও প্রতারণার ১২৪টি মামলা হয়। এর মধ্যে ১২টি মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয় তার। ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল বিদেশে পালানোর সময় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেফতার করে কুষ্টিয়া জেলখানায় পাঠানো হয়। ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট কারাগারের প্রধান ফটক ভেঙে আনিসুর রহমানসহ ১০৪ জন আসামি পালিয়ে যান। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে কুমারখালী থানায় ভিড় করেন ভুক্তভোগীরা। পুলিশ তাদের আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেন।

রাজবাড়ীর পাংশার আব্দুল মাজেদ (৬৪) বলেন, সারা জীবন গার্মেন্টসে চাকরি করে দেড় লাখ টাকা জমিয়েছিলাম। চার বছরে দ্বিগুণ লাভের আশায় আনিসুরের এনজিওতে রেখেছিলাম। দুই বছরের মাথায় সব টাকা নিয়ে পালিয়েছে সে। আমি আমার টাকা ফেরত চাই।

আনিসুর রহমানের ভাগনে বিনা খাতুন বলেন, ‘দ্বিগুণ লাভের আশায় মামার কাছে তিন লাখ টাকা রেখেছিলাম। এখন সব শেষ। হয় টাকা ফেরত দিক, না হলে ওর ফাঁসি হোক।’

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর আলাউদ্দিন নগরে অবস্থিত বিশ্বাস ফাউন্ডেশনের আওতায় বিশ্বাস সঞ্চয় ঋণদান ও সমবায় সমিতি লিমিটেডের চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত ছিলেন তিনি। কুমারখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একসময় কর্মরত অফিস সহায়ক মৃত ইব্রাহিম বিশ্বাসের ছেলে আনিসুর রহমান ২০০৬ সালে বিশ্বাস সঞ্চয় ঋণদান ও সমবায় সমিতি লিমিটেড নামে একটি এনজিও চালু করেন। এরপর বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা দেওয়ার আশ্বাসে সমিতির সদস্য সংগ্রহ শুরু করেন। এনজিও’র সদস্যরা লাখে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা মাসিক লভ্যাংশের আশায় লাখ লাখ টাকা লগ্নি করতে থাকেন বিশ্বাস ফাউন্ডেশনে। এভাবেই দেশের ৯টি জেলায় বিভিন্ন নামে ৫৮টি এনজিওর শাখা তৈরি করা হয়। ৫৮টি শাখায় প্রায় ১৫৩ জন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয় এবং কর্মচারীদের নিকট থেকে একাধিক ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্প নেওয়া হয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার কথা বলে। এসব কর্মী দিয়ে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখিয়ে শত কোটি টাকা বিশ্বাস ফাউন্ডেশনে লগ্নি করানো হয়। এরপর বিশ্বাস ফাউন্ডেশনের মূল অফিসে তালা ঝুলিয়ে লাপাত্তা হয়ে যান তিনি।