কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে ৩ ট্রাক পণ্য পাচার, দুই কর্মকর্তা বরখাস্ত

যশোরের শার্শা উপজেলার বেনাপোলে বেড়েই চলেছে কাস্টমস ও বন্দর কর্মকর্তাসহ শুদ্ধফাঁকিবাজ চক্রের দৌরাত্ম্য। কোনও কিছুতে থামানো যাচ্ছে না দেশের বৃহত্তম এই স্থল বন্দরের শুল্ক ফাঁকি। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে গত মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বেনাপোল বন্দরের ২৯ নম্বর শেড থেকে তিন ট্রাক পণ্য পাচার করে ইয়ান ভাজাওয়ালার ছেলে সামাদ ও আলোচিত ‘নো-এন্ট্রির’ জনক হিরু গং বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

কোটি টাকার এই পণ্য পাচারে সহযোগিতায় জড়িত থাকার অপরাধে কাস্টমসের দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্তকৃত সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) তরিকুল ইসলাম এবং সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) শহিদুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করে জনপ্রশাসন শাখায় সংযুক্ত করা হয়েছে বলে অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অব কাস্টমস মুক্তা চৌধুরীর সই করা পত্রে জানা গেছে। তবে এ ব্যাপারে কোনও শেড ইনচার্জের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার খবর মেলেনি।  

জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সহযোগিতায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এ ঘটনা উদঘাটন করেছে বলে জানা গেছে। তবে এই ঘটনার নেপথ্যে আর কেউ জড়িত আছে কিনা তা অবশ্য জানা যায়নি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা ছাড়া এমন ঘটনা ঘটানো সম্ভব নয় বলে ব্যবসায়ীদের অভিমত। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার বেনাপোল স্থলবন্দরের ২৯ নম্বর শেড থেকে প্রকাশ্য দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে একটার মধ্যে তিন ট্রাক পণ্য পাচার করা হয়। 

ভারতের দুটি ট্রাকে করে আমদানিকারক ঢাকার মৌলভী বাজারের সাদিয়া এন্টারপ্রাইজ ফেব্রিক্সের একটি পণ্য চালান আমদানি করেন। কাস্টমস এবং বন্দর থেকে পণ্য খালাসের দায়িত্ব পড়ে মেসার্স প্রত্যয় ইন্টারপ্রাইজ নামের একটি সিঅ্যান্ডএফ-এর এজেন্টের ওপর। সিঅ্যান্ডএফ প্রত্যয় ইন্টারপ্রাইজ লাইসেন্সের আসল মালিক হাফিজুর রহমান হ্যাপী। এই লাইসেন্সটি ভাড়া নিয়ে যত অবৈধ কাজ করে সামাদ ও আজিম নামে দুই জন। 

অভিযোগ রয়েছে, কাস্টমসের সহকারী কমিশনার তওফিকুর রহমানসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির মহড়া চালায় তারা। এদের অন্যতম সহযোগী হচ্ছেন আলোচিত হিরু। 

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বেনাপোল বন্দরের ২৮, ২৯, ৪১, ১২, ১৫, ১৭, ৩০ ও ৪২ নম্বরসহ বিভিন্ন শেডে শুল্ক ফাঁকির নানা কৌশল ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।  

এছাড়া আলোচিত এই হিরুর মাধ্যমে ১২, ১৫ ও ১৭ নম্বর শেডেও কাস্টমস এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় চলছে শুল্ক ফাঁকির উৎসব। এসব শেড ছাড়াও ৪২ ও ৩০ নম্বর শেডেও কর্তাদের ম্যানেজ করে দেদারসে চালাচ্ছে শুল্ক ফাঁকি। 

অভিযোগ রয়েছে, দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলে অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, আমদানিকারক এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের যোগসাজশে চলছে ভয়াবহ রাজস্ব ফাঁকির রমরমা বাণিজ্য। মিথ্যা ঘোষণা, উচ্চ শুল্কের পণ্যের বদলে স্বল্প শুল্কের পণ্যের আড়ালে অবৈধ পণ্য খালাসে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এর সঙ্গে নো-এন্ট্রির মাধ্যমে বন্দর থেকে সরাসরি পণ্য পাচারের ঘটনায় সরকার বিপুল অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতের রফতানিকারকদের সঙ্গে যোগসাজশে মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করে পণ্য আমদানি করছে। এর মধ্যে রয়েছে ওজনে কম দেখানো, পণ্যের প্রকৃত মান গোপন করা এবং ভুল এইচএস কোড ব্যবহার করে উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্যের বদলে স্বল্প শুল্কের পণ্য হিসেবে খালাস নেওয়া। এই বন্দরে অসাধু ব্যবসায়ীরা বৈধ পণ্যের আড়ালে উচ্চমূল্যের ভারতীয় শাড়ি, থ্রি-পিস, লেহেঙ্গা, ব্লেড, দামী কেমিক্যাল, বিভিন্ন কসমেটিকস, ইমিটেশন সামগ্রী ও ফেসওয়াস ক্রিমসহ বিভিন্ন দামি পণ্য নিয়ে আসে। 

আরও জানা যায়, বন্দরে সিসিটিভি ক্যামেরা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও দিনের বেলায় কাস্টমস এবং বন্দরের একশ্রেণির কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় বন্দর শেড থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার পণ্য। আবার বৈধভাবে আনা পণ্য শুল্ক না দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে হর হামেশায়। এমনকি বন্দরের হেফাজতে রাখা আটক পণ্য সরিয়ে সেখানে নিম্নমানের পণ্য রাখার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনাও ঘটেছে। রাজস্ব ফাঁকির বিরুদ্ধে কাগজে-কলমে কঠোর অবস্থানের কথা বলছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না।  

ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রকৃত হোতাদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় না আনলে এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে না। বন্দর ব্যবহারকারী ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বন্দরের স্বচ্ছতা ও রাজস্ব সুরক্ষা নিশ্চিত করা হোক। অব্যবস্থাপনা দূর করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন বলে ব্যবসায়ীদের দাবি। 

বেনাপোল বন্দরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রুহুল আমিন বলেন, “শেডে সংরক্ষিত পণ্য নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা প্রত্যেকের ভূমিকা যাচাই করা হচ্ছে। কারও বিরুদ্ধে কোনও অবহেলা বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” একই সঙ্গে শেডের চাবি ব্যবস্থাপনা, পণ্য সংরক্ষণ, প্রবেশ ও বের হওয়ার তথ্য এবং ওজন ব্যবস্থাপনা আরও কঠোরভাবে তদারকির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।