খুলনায় বেসরকারি নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আয়মান মো. আজমুল হোসেনকে নির্যাতনের পর জোর করে ভাত চুরি, মোবাইল ফোন ও টাকা চুরির স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল। নির্যাতনের একপর্যায়ে তার সেই বক্তব্যের ভিডিও ধারণ করেছিল কয়েকজন। পরে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হলে আজমুল আতঙ্কে চার তলার ছাদ থেকে পাশের তিন তলায় লাফ দেন। সেখান থেকে পা পিছলে নিচে পড়ে মৃত্যু হয় তার।
বুধবার রাতে গ্রেফতার হওয়া খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী শেখ আসিফ হোসেন (২৮) স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি-৬) জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য দিয়েছেন। পাশাপাশি ওই দিনের ঘটনায় সম্পৃক্ত ছিলেন মর্মে বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে খুলনা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন তিনি। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ নিয়ে আজমুল হত্যায় এখন পর্যন্ত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক তিন শিক্ষার্থীসহ চার জনকে গ্রেফতার করা হলো। এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল হোসেন।
সবশেষ গত মঙ্গলবার রাত আড়াইটার দিকে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার ভাটিয়াপাড়া গোলচত্বর থেকে শেখ আসিফ হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। বুধবার তাকে হরিণটানা থানায় হস্তান্তর করেছে এসআরবি। আসিফ হোসেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিনের ১৮ ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী। তিনি খুলনার পাইকগাছা উপজেলার সনাতনকাটি গ্রামের শেখ মিরাজের ছেলে।
এসআরবি-৬ অধিনায়ক নিস্তার আহমেদ বুধবার রাতে জানিয়েছেন, আজমুল হত্যা মামলায় সবশেষ শেখ আসিফ হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কেএমপির হরিণটানা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে আজমুল হত্যার বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন আসিফ। তিনি বলেছেন, একটি ব্যাংকে তার চাকরি হয়েছিল এবং ২০ সেপ্টেম্বর যোগদানের কথা ছিল। সে জন্য বিদায় নিতে গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল-সংলগ্ন ওই ভবনে তার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে যান। গিয়ে দেখেন আজমুলকে মারধর করছেন সহপাঠী ও বন্ধুরা।
নিস্তার আহমেদ বলেন, আসিফ জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানিয়েছেন মারধরের একপর্যায়ে আজমুলকে চার তলার ছাদে নিয়ে আবার মারধর করা হয়। চুরি করে ভাত খাওয়া, মোবাইল ফোন ও টাকা চুরির কথা তাকে দিয়ে স্বীকার করানোর চেষ্টা করা হয়। এ সময় উপস্থিত বন্ধুরা আজমুলের বক্তব্যের ভিডিও ধারণ করেছিল। পরে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। ভয়ে আজমুল চার তলার ছাদ থেকে তিন তলায় লাফ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু পা পিছলে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান। ওই দিন রাতে আজমুলের মৃত্যুর পর আত্মগোপনে চলে যান আসিফ।
নিস্তার আহমেদ আরও বলেন, ‘তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য আলামত যাচাই করে তার বক্তব্যের সত্যতা খতিয়ে দেখছি আমরা।’
জিজ্ঞাসাবাদে আসিফ আরও দাবি করেছেন, মেস ম্যানেজার মেহেদী এবং কৃষি ব্যাংকের খুলনার টাউন নওয়াপাড়া শাখার ক্যাশ অফিসার হাসনাত হাবিব রিফাত এ ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তারাই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী। এ ছাড়া খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা হলের সামনে থাকা মা-বাবার দোয়া তানহা জুস কর্নারের মালিক তারেক হাসান রুবেল আজমুলকে বেশি মারধর করেছেন বলেও আসিফ জানিয়েছেন।
এর আগে মঙ্গলবার রাতে কৃষি ব্যাংকের টাউন নওয়াপাড়া শাখার ক্যাশ অফিসার হাবিব রিফাত (৩০) এবং মা-বাবার দোয়া তানহা জুস কর্নারের মালিক তারেক হাসান রুবেলকে (৩৫) গ্রেফতার করেছিল এসআরবি। একই ঘটনায় প্রতাপ সরকার (২৮) নামে আরও একজনকে গ্রেফতার করেছিল ডিবি পুলিশ। পরে শেখ আসিফকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে এ মামলায় মোট গ্রেফতারের সংখ্যা দাঁড়ালো চার জনে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এর আগে আজমুলকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রোটেকনোলজি বিভাগের ১৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী প্রতাপ সরকার ও তারেক হাসান রুবেল। বুধবার দুপুরে খুলনা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইব্রাহিম খলিল তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এর আগে মঙ্গলবার রাতে দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফএমআরটি বিভাগের ১৬ ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী ও ব্যাংক কর্মকর্তা হাবিব রিফাত।
হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল হোসেন বলেন, ‘আজমুল হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত চার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রতাপ সরকারকে ডিবি এবং বাকি তিন জনকে এসআরবি আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। এর মধ্যে হাবিব রিফাত, প্রতাপ সরকার ও তারেক হাসান রুবেল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। শেখ আসিফ হোসেন আজ জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলার অন্যতম আসামি মেহেদীকে গ্রেফতার করা গেলে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।’
গত শুক্রবার রাতে প্রথমে ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগ তুলে আজমুল হোসেনকে পেটানো শুরু হয়। পরে মেসে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের কাপড়, টাকাপয়সাসহ বিভিন্ন জিনিস চুরির অভিযোগ তোলা হয়। চার তলা মেস ভবনের ছাদে পেটানোর একপর্যায়ে আজমুল নিচে পড়ে মারা যান। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার বাড়ি চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানায়। এ ঘটনায় আজমুলের বাবা মো. কুতুব উদ্দীন বাদী হয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও বর্তমান চার শিক্ষার্থীর নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করে মামলা করেন।