এক জেলায় ভেরিফিকেশনে বাদ ১০৬ জন, কৃষক বাবা বললেন ‘রাজনীতি করি না, অপরাধটা কী’

যশোর শহরের স্টেডিয়ামপাড়ার একটি ছাত্রাবাসে থেকে পড়াশোনা করেন মাহফুজুর রহমান। ২০২৫ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। মনিরামপুর উপজেলায় চূড়ান্তভাবে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন তিনি। জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেডিক্যাল সার্টিফিকেটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন নিয়োগপত্র পাওয়ার। পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে সরকারি চাকরিতে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হওয়ায় খুশি হন মা-বাবাসহ আত্মীয়স্বজনরা। খুশিতে মসজিদে ঘোষণা দিয়ে এলাকায় মিষ্টি বিতরণ করেছিলেন। কিন্তু অন্যরা নিয়োগপত্র পেলেও পাননি মাহফুজুর। এখন কষ্ট ও হতাশা নিয়ে ছাত্রাবাস থেকে বাড়ি ফিরতে পারছে না।

মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘সরকারি চাকরি করার স্বপ্ন নিয়ে গ্রাম থেকে যশোরে এসেছিলাম। আট বছর ধরে ছাত্রাবাসে থেকে পড়াশোনা করছি। অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষা দেই। এর মধ্যে ২০২৫ সালে সহকারী প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলাম। তখন বাড়ির লোকজন খুশি হয়। এলাকায় মিষ্টি বিতরণও করে। স্বপ্নও দেখতে শুরু করি, একজন আদর্শ শিক্ষক হবো। দীর্ঘ আট মাস ধরে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি। গত বৃহস্পতিবার চূড়ান্তভাবে নির্বাচিতদের নিয়োগপত্র দেওয়া শুরু হয়। ওই তালিকায় আমার নাম না পেয়ে জেলা অফিসে যোগাযোগ করি, তারা জানায় গোয়েন্দা ভেরিফিকেশন রিপোর্টের ভিত্তিতে আমাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ভেরিফিকেশনে অযৌক্তিকভাবে আমাকে বাদ দেওয়া হয়েছে।’

কান্নাজড়িতকণ্ঠে মাহফুজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার চাকরি হওয়ায় মা-বাবা অনেক খুশি হয়েছিলেন। এলাকায় সবাই জানে আমার চাকরি হয়েছে। এখন যদি চাকরি না হয়; কোন মুখ নিয়ে বাড়িতে যাবো।’

চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি সহকারী শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এই পরীক্ষায় মোট ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থী সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হন। গত বৃহস্পতিবার দেশের বিভিন্ন জেলায় চূড়ান্তভাবে নির্বাচিতদের নিয়োগপত্র দেওয়া শুরু হয়। 

এর মধ্যে যশোরে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন ২৯০ জন। তাদের মধ্যে ১৮৪ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে। আর ভেরিফিকেশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে ১০৬ জনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে নিয়োগপত্র না পেয়ে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে।

উপায় না পেয়ে শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস চত্বরে জড়ো হতে থাকেন বাদ পড়া প্রার্থীরা। অফিসের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কোনও সাড়া না পেয়ে চলে যান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। সেখানে জড়ো হয়ে অবস্থান কর্মসূচিতে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন নিয়োগপত্র না পাওয়া এসব শিক্ষার্থী। তাদের সঙ্গে যোগ দেন অভিভাবকরাও। এ সময় নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তারা।

নিয়োগপত্র না পাওয়া হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমি অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছি। এখন ভেরিফিকেশনের কারণে নিয়োগ না পাওয়ায় আমি ও আমার পরিবারের সদস্যরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। খবরটি শোনার পর থেকে মা কান্না করছেন, বাবাও স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন। আমাকে কেন বাদ দেওয়া হয়েছে, সেটি স্পষ্টভাবে জানানো হোক।’ 

ডিসি অফিস চত্বরে অবস্থান করা সুপারিশপ্রাপ্তরা প্রতিমন্ত্রীর পথ আটকে ধরেন

হাবিবুরের মতো ৮০ থেকে ৯০ জনের দেখা মিললো জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে। তাদের সবার হাতে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার কাগজপত্র। সবার চোখে মুখে হতাশার চাপ।

সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর আবার কীসের ভেরিফিকেশন। এটা প্রহসন। আমাদের সঙ্গে জুলুম করা হয়েছে। আমাদের স্বপ্নকে কবর দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ না করলে চাকরি হবে না-এমন নীতি ছিল গত সরকারের সময়। সেই পথে যদি এই সরকারও হাটে, তাহলে কীসের পরিবর্তন।’ 

তিন বলেন, ‘প্রাথমিকে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ায় গত আট মাস ধরে অন্য কোথাও আবেদন করিনি। এমনকি মাঝে ডাক বিভাগে ভাইভার জন্য ডেকেছিল; সেখানেও যাইনি। ভেরিফিকেশনের বিষয়টি পুনরায় যাচাই করে আমাদেরকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানাচ্ছি।’

ছেলের সঙ্গে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে এসেছেন আব্দুল হামিদ। পেশায় কৃষক এই বাবা বলেন, ‘বিনা টাকায় চাকরি হওয়ায় গ্রামের মানুষও খুশি হয়েছিল। কাল রাতে শুনি ছেলেরে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেছি। ছেলের মা খাওয়াদাওয়া বাদ দিয়েছে। হওয়া চাকরি থেকে এভাবে বাদ দেওয়া অবিচার। আমি আর আমার ছেলে কোনও দলের রাজনীতি করি না। তাহলে আমাদের অপরাধটা কী। আমার ছেলেরে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’

এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা অফিস কিংবা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা এ বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি। দফতরে গেলেও তাদের পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে যোগাযোগ করলেও রিসিভ করেননি। 

এদিন দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের একটি কর্মসূচিতে সরকারি সফরে আসেন যশোর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য, বিদ্যুৎ, জ্বালানি খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এ সময় ডিসি অফিস চত্বরে অবস্থান করা সুপারিশপ্রাপ্তরা প্রতিমন্ত্রীর পথ আটকে ধরেন। পরে প্রতিমন্ত্রী তাদের কথা শুনে সভাকক্ষে প্রবেশ করেন। প্রতিমন্ত্রী তাদের বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ও জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা দ্রুতই আপনাদের সমস্যা সমাধান কিংবা বাদ দেওয়ার কারণ জানাবেন।’