সুন্দরবনে ২০ দিনে ৩ অগ্নিকাণ্ড : চলছে মাছ ধরার জলাশয় তৈরির চক্রান্ত

পূর্ব সুন্দরবনের চাদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের নাংলী ফরেস্ট ক্যাম্প এলাকায় সোমবার বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে আবারও আগুন লেগেছে। এর আগে ১৩ এপ্রিল বুধবার সকালে একই এলাকায় আগুন লেগেছিল। এ নিয়ে সুন্দরবনের চাদপাই রেঞ্জের নাংলী এলাকায় গত বিশ দিনে তিনবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটল। সোমবার দুপুর ১২ টার দিকে সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. সাইদুল ইসলাম বনে আগুন লাগার খবর নিশ্চিত করেন।

সুন্দরবনে ধানসাগর স্টেশনে ফিবছর আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে বন সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগের আঙুল স্থানীয় চিহ্নিত কিছু ব্যক্তির দিকে। শরণখোলা উপজেলার উত্তর রাজাপুর ও ধানসাগর এলাকার কয়েকটি অসাধু মৎস্য শিকারী চক্র প্রতি বছর ওই স্থান থেকে মাছ শিকারের জন্য সুন্দরবনে আগুন লাগিয়ে থাকে। শুষ্ক মৌসুমের এই সময়ে মাছের বিল তৈরি জন্য তারা আগুন লাগিয়ে বন পরিষ্কার করে। বর্ষা এলেই শুরু হয় ওই চক্রের মাছ ধরার মহোৎসব।

সুন্দরবনে আগুনআগুন লাগার ঘটনাকে নাশকতা হিসেবে চিহ্নিত করে ডিএফও সাইদুল ইসলাম জানান, কে বা কারা নাশকতার জন্য নাংলী এলাকায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এঘটনার পর মোরেলগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট দ্রুতই ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভাতে শুরু করে। ঘটনাস্থলে কোস্টগার্ডের একটি দলও সুন্দরবনের ওই স্থানে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজে সহায়তা করেছেন বলে জানান এই বন কর্মকতা। মাত্র চার দিনের ব্যবধানে শরণখোলা উপজেলাধীন নাংলী এলাকায় বনে আগুন লাগার ঘটনা পরিকল্পিত বলে দাবি করে তিনি বলেন, এর আগে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বনবিভাগের পক্ষ থেকে চিহ্নিত ব্যক্তিদের নামে মামলা করা হয়েছে। তাদের কেউ বনবিভাগকে হেয় প্রতিপন্ন করতে নাশকতার উদ্যেশ্যে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন। শরণখোলা থানায় নাশকতার অভিযোগে মামলা করা হবে বলে তিনি জানান।
ধানসাগর ফরেস্ট কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ জানান, নাংলী এলাকার যে বনে দুর্বৃত্তরা আগুন দিয়েছে সেখানে তেমন কোন গাছপালা নেই। বন বিভাগের লোকজন সর্তক থাকায় অল্প সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছে। মোরেলগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও কোস্টগার্ডের অপর একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ করছে। অসৎ উদ্দেশ্যে সকাল ১১ টার দিকে সুন্দরবনের চাদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের আবদুল্লার ছিলা এলাকার ছলে বনে আগুন লাগানো হয়েছে। সুন্দরবনে আবারও আগুন লাগার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে তা নেভানোর জন্য বাগেরহাট ফায়ার সার্ভিস ও মোড়েলগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ইউনিটকে বলা হয়। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই মোড়েলগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে বনবিভাগের কর্মীদের সহযোগিতায় আগুন নেভাতে শুরু করে। তবে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়।
এদিকে রাজাপুর ও ধানসাগর এলাকার একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে বন কর্মকর্তারা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ওই চক্রের কাছে স্থানগুলো মৌসুম ভিত্তিক অলিখিত ইজারা (লিজ) দেয়। পরে সেখানে কারেন্ট জাল পেতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শিকার করা হয়। প্রতি মৌসুমে লাখ লাখ টাকা আয় হলেও সরকার কোনও রাজস্ব পায় না। পকেট ভারি হয় বনবিভাগের কিছু লোকের।  দুএকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া, অনেক সময় একশ্রেণির অসাধু বন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ ঘটিয়ে করে শাসকদলের প্রভাবশালীরা সুন্দরবনের খাল-বিলে কথিত ইজারার মাধ্যমে মাছ চাষ করার সহজ রাস্তা তৈরির উপায় হিসেবে পরিকল্পিতভাবে বনে আগুন ধরিয়ে দেয়।

আরও পড়ুন: কুড়িগ্রামকুড়িগ্রামে বিএসএফ-এর গুলিতে বাংলাদেশি নিহত

উল্লেখ্য, ২৮ মার্চ সুন্দরবনে নাংলী এলাকার বনে আগুন লাগার ঘটনায় গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি ৪ এপ্রিল সুন্দরবন পূর্ব বিভাগীয় কর্মকর্তা  মো. সাইদুল ইসলামের কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই রির্পোটে বনজীবী ও স্থানীয়দের অসতর্কতাকে অগ্নিকাণ্ডের জন্য দায়ী করা হয়। এ ঘটনার ১৬ দিন পর ১৩ এপ্রিল আবার আগুন ধরে নাংলি ফরেস্ট ক্যাম্পের কাছে আব্দুল্লাহর ছিলার শেষ প্রান্তে পচাকোড়ালিয়া ও নাপিতখালী এলাকায়। আগুনে পুড়ে যায় ৮ দশমিক ৫৫ একর বনভূমি । ইচ্ছাকৃতভাবে বনে অগ্নিসংযোগের অভিযোগে ছয়জন চিহ্নিত ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাদের  বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। তবে ওই ঘটনায় গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন এখনও জমা দেয়নি।

/এইচকে/