ওরা তোকে বাঁচতে দেবে না বাবা: আমি জমি বেচে দিচ্ছি, তুই বিদেশে চলে যা

ছোটবেলা থেকেই দুষ্টু প্রকৃতির ছিলেন টুটুল। ডাক্তারি পাস করার পর সেই টুটুলই হয়ে ওঠেন চরমপন্থিদের তাত্ত্বিক নেতা। সম্পদশালী পরিবারের সন্তান হওয়ায় জমি বিক্রি করে সমাজসেবার পাশাপাশি বাম রাজনীতির নামে চরমপন্থি সংগঠনে জড়িয়ে পড়েন। বিয়ের পর তার স্ত্রীও একই দলে যোগ দেন। কিন্তু সন্তান জন্মের পর স্ত্রী একসঙ্গে দল ও স্বামী টুটুলকে ছেড়ে চলে যান। 

অন্যদিকে মা নভেরা খাতুন চাইতেন ছেলেকে বাঁচাতে। এজন্য জমি বিক্রি করে টুটুলকে বিদেশে পাঠাতেও চেয়েছিলেন। কিন্তু টুটুল তাতে সায় দেননি। শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন।

ডা. মিজানুর রহমান টুটুল, যিনি ‌‘চরমপন্থি টুটুল’ নামে পরিচিত ছিলেন, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল-লাল পতাকা) তাত্ত্বিক নেতা ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তার আরেকটি ছদ্মনাম ছিল ‘কমরেড রাকেশ কামাল’।

১৯৮৫ সালে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন টুটুল। এরপর অল্প কিছুদিন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে চাকরিও করেন। তবে চিকিৎসা পেশায় বেশিদিন থাকা হয়নি। সাম্যবাদী ও মাওবাদী আদর্শে দীক্ষিত হয়ে জড়িয়ে পড়েন সশস্ত্র চরমপন্থি রাজনীতিতে।

‘লাল পতাকা’ গঠন, মূল নেতৃত্বে টুটুল

পেশায় চিকিৎসক হলেও সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে সশস্ত্র সমাজতান্ত্রিক বা মাওবাদী আদর্শে দীক্ষিত হয়ে চরমপন্থি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন টুটুল। দলের অপর তাত্ত্বিক নেতা মোফাখখার চৌধুরীর সঙ্গে বিপ্লবের প্রশ্নে মতবিরোধ দেখা দিলে তিনি মূল দল থেকে বেরিয়ে আসেন। ২০০২ সালে পাবনার কামরুল ইসলাম মাস্টারের সঙ্গে মিলে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির মূল দল থেকে বিভক্ত হয়ে ‘লাল পতাকা’ গঠন করেন টুটুল। এরপর সংগঠনের মূল নেতৃত্বে চলে আসেন তিনি। পার্টির কাজে তাকে সহযোগিতা করতেন মধু বাবু।

২০০৮ সালের জুলাই মাসে ঢাকার উত্তরা বা মিরপুর এলাকা থেকে তৎকালীন র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) টুটুলকে গ্রেফতার করে।

ছেলেকে বাঁচাতে মায়ের আকুতি

২৬ জুলাই কোটচাঁদপুর থানার পুলিশ বাড়িতে গিয়ে টুটুলকে গ্রেফতারের খবর তার মা নভেরা খাতুনকে জানায়। এরপর প্রায় ২০০ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিতে যান তিনি। স্মারকলিপিতে নভেরা খাতুন উল্লেখ করেন, তার ছেলে কোনও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন। এলাকায় দয়ালু ডাক্তার হিসেবে টুটুলের সুনাম রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। ছেলেকে ‘ক্রসফায়ারে’ না দিয়ে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান মা।

কিন্তু নভেরা খাতুনের সেই আহ্বানে সরকারের তরফ থেকে কোনও সাড়া মেলেনি বলে তিনি দাবি করেন। শেষ পর্যন্ত ছেলের প্রাণ বাঁচাতে ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনও করেন তিনি।

পরবর্তীকালে ২০০৮ সালের ২৭ জুলাই ভোররাতে রাজশাহী ও নওগাঁ জেলার সীমান্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ টুটুল নিহত হন।

মেধাবী ছাত্র থেকে চরমপন্থি নেতা

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক—উভয় পরীক্ষায় মিজানুর রহমান টুটুল বোর্ডের মেধা তালিকায় স্থান পান। এরপর চিকিৎসক হওয়ার জন্য রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন তিনি। ছাত্রাবস্থায়ই সাম্যবাদী আদর্শে দীক্ষিত হয়ে সশস্ত্রধারার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) রাজনীতিতে জড়িয়ে দ্রুতই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। পরে সাংগঠনিক ও তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে পরিচিতি পান। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (লাল পতাকা) দেশের অন্যতম মাওবাদী দলে পরিণত হয়।

কোটচাঁদপুরের উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান

ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুরের এলেঙ্গায় এক উচ্চবিত্ত পরিবারে জন্ম টুটুলের। তার মায়ের নাম নভেরা খাতুন। একমাত্র বোন নুরজাহান বেবী। দেশে সর্বহারা মানুষের রাজনীতি কায়েম করতে গিয়ে টুটুল তার পরিবারের সবটুকু জমি বিক্রি করে দিয়েছিলেন বলে জানান তার মা।

নভেরা খাতুনের ভাষ্য, ছোটবেলায় টুটুল খুব দুষ্টু ছিল। হাইস্কুলে পড়ার সময় থেকে ধীরস্থির হতে থাকে। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সময় কমিউনিস্ট রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে। এমনকি মেডিক্যাল কলেজের পড়াশোনা শেষ না করেই পুরোপুরি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়তে চেয়েছিল। তখন তার বাবা তাকে বলেছিলেন, ‘তোমার পেছনে টাকা খরচ করলাম, তুমি অন্তত ডাক্তারি পাসটা করো।’ ডাক্তারি পাস করার পর টুটুল একদিন বাবার সামনে এসে বলেন, ‘এই নাও তোমার ডাক্তারি পাসের সার্টিফিকেট।’

তিনি বলেন, ‘এরপর বাবা তাকে চাকরিতে ঢোকার জন্য খুব পীড়াপীড়ি করেন। টুটুল মাত্র এক মাস সরকারি চাকরি করে। এরপর থেকেই পুরোপুরি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে।’

তুই তাদের শত্রু হয়ে যাবি

মা নভেরা খাতুন বলেন, আমার আশা ছিল ছেলে একদিন প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার হবে, একটি সুখী পরিবার হবে। কিন্তু কমিউনিস্ট রাজনীতিতে গিয়ে টুটুল চাকরি করেনি। শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলতো সবসময়।আমি বলতাম, বড় লোকেরা তাদের সম্পদ ত্যাগ করবে না। তুই তাদের শত্রু হয়ে যাবি। সরকারও বড় লোকদের পক্ষে থাকবে। ওরা তোকে বাঁচতে দেবে না। শহীদকে (মোফাখখর চৌধুরী) ক্রসফায়ারে হত্যা করার পর পুলিশ এসে খবর দেয়, টুটুলকেও হত্যা করা হয়েছে। পরে জানা যায়, সেটি ছিল ভুল খবর।’

এরপর টুটুলের সঙ্গে যোগাযোগ হলে তাকে সতর্ক করেন মা। নভেরা খাতুনের ভাষ্য, ‘শহীদকে ওরা হত্যা করেছে, এবার কিন্তু তোকে খুঁজে বের করবে। ওরা তোকে বাঁচতে দেবে না বাবা। আমি জমি বেচে তোকে টাকা দিচ্ছি, তুই বিদেশে চলে যা। আমার কথা শুনে টুটুল চুপ করে থাকতো এবং মিটমিট করে হাসতো।’

ওর মুখের দিকে তাকালে কেউ বলবে না, খারাপ কাজ করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন নভেরা খাতুন। তিনি বলেন, ‘পত্রিকায় লাল পতাকা সম্পর্কে বানোয়াট রিপোর্ট করানো হতো তখন। পত্রিকাগুলো তাদের দলের মতামত প্রকাশ করতো না। টুটুল মানুষের উপকার করে বেড়াতো। ওর মুখের দিকে তাকালে, ওর চেহারা দেখলে কেউই বলতে পারবে না ও কোনও খারাপ কাজ করতে পারে। যে মানুষটা ডাক্তারি পাস করার পর নিজের সুখ-সাচ্ছন্দ্য না দেখে গরিব মানুষের জন্য কাজ করতে গেলো, সে খারাপ হয় কী করে?’

চরমপন্থি রাজনীতির পরিণতি

একসময় চরমপন্থি সংগঠনগুলোর চাঁদাবাজি ও হত্যাযজ্ঞে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা অশান্ত হয়ে ওঠে। শ্রেণিশত্রু খতমের নামে অভ্যন্তরীণ কোন্দলেও অনেক প্রাণহানি ঘটে। পরবর্তীকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘বন্দুকযুদ্ধে’ চরমপন্থি সংগঠন লাল পতাকা ও জনযুদ্ধের প্রথম সারির প্রায় সব নেতা নিহত হন। ফলে একপর্যায়ে এসব সংগঠন অনেকটাই নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে।