সবজিজোন-খ্যাত যশোরে কৃষি অর্থনীতির পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে খেজুরের গুড়। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, দেশের সর্বোচ্চ গুড় উৎপাদনকারী এ জেলায় গত পাঁচ বছরে গুড়ের উৎপাদন বেড়েছে ১০ শতাংশ। সম্প্রতি জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়া যশোরের খেজুর গুড় চার মাসের মৌসুমে বেচাকেনা হয় প্রায় দেড়শত কোটি টাকার। এতে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও গ্রামীণ জনপদের অর্থনীতি চাঙা হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, নিরাপদ খেজুর রস ও গুড় উৎপাদনে কৃষকদের পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করছে কৃষি বিভাগ। পাশাপাশি বাড়ছে গুড়ের বাজার, তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান এবং কৃষকেরাও পাচ্ছেন বাড়তি আয়ের সুযোগ।
চৌগাছা উপজেলার পঞ্চাশোর্ধ্ব মিসকিন দফাদার। বছরে সাত মাস দুই ছেলের কৃষিজমিতে মাঝে-মধ্যে সহযোগিতা করলেও শীতের পাঁচ মাস ব্যস্ত থাকেন খেজুরগাছ পরিচর্যায়। বলা চলে, সকাল কিংবা রাত কাটে খেজুর গাছের সঙ্গেই। আর এই পাঁচ মাসে গুড় ও রস বিক্রি করে যে আয় করেন, তা বাকি সাত মাসে কৃষিজমিতে ফসল উৎপাদন থেকে পাওয়া আয়ের প্রায় দ্বিগুণ।
মিসকিন দফাদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বর্গাসহ পাঁচ বিঘা জমিতে ধান, পাট ও সবজি আবাদ করলেও তেমন লাভ নেই। রোদ-বৃষ্টিতে পরিশ্রমই সার। খরচ বাদ দিলে লাভ থাকে না। কিন্তু শীতকাল আসলেই নিজের কিছু খেজুর গাছের সঙ্গে এলাকার কৃষকের খেজুর গাছ ভাগে নিই। এতে খাটুনি হলেও আগের চেয়ে বদলে গেছে জীবন।’
প্রায় ৩৫ বছর ধরে খেজুর গাছ কাটার অভিজ্ঞতা রয়েছে এই গাছির। নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে ২৫ থেকে ৩০ মণ ধান হয়। সেই ধানের দাম পাওয়া যায় ৩০ থেকে ৩৬ হাজার টাকা। সেচ, সার, চারা রোপণ, শ্রমিক, ফসল উৎপাদনের সময় কাটা-মাড়াইসহ ২৫ হাজারের বেশি টাকা খরচ হয়। সেই ধান উৎপাদন করতে সময় লাগে চার মাস। কিন্তু শীতের সময়ে চার মাস খেজুর গাছ পরিচর্যা করে রস-গুড় বিক্রি করে ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হয়।’
তিনি বলেন, ‘আগে খেজুর গুড়ের দাম ছিল না, তাই ভালো দাম পাওয়া যেত না। গত পাঁচ বছর ধরে রস-গুড়ের দাম ভালো হওয়ায় গেল মৌসুমেও ৮০ হাজার টাকার গুড় বিক্রি করেছি।’
৯৫ লাখ কেজি গুড় উৎপাদন
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, যশোর জেলায় ২৩ লাখ ৩০ হাজার ৬৯৫টি খেজুর গাছ রয়েছে। এর মধ্যে রস আহরণের উপযোগী গাছের সংখ্যা তিন লাখ সাত হাজার ১৩০টি। জেলায় একটি গাছে বছরে গড়ে ২০ কেজি খেজুরের রস হয়। তা থেকে পাওয়া যায় প্রায় ৮ কেজি খেজুরের গুড়। সব মিলিয়ে জেলায় মৌসুমে প্রায় ৯৫ লাখ কেজি বা সাড়ে ৯ হাজার মেট্রিক টন গুড় উৎপাদন হয়। যার বাজারমূল্য প্রায় ১৫০ কোটি টাকা।
বাবার পেশা ধরে রেখেছেন রুবেল
সাধারণত গাছির ছেলে গাছি হওয়ার প্রবণতা কম। তবে চৌগাছার বড় খানপুর গ্রামের রুবেল হোসেন ধরে রেখেছেন তার বাবা ইউসুফ আলীর পেশা। পাঁচ বছর ধরে তিনি খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করে গুড়-পাটালি তৈরির কাজ করছেন।
রুবেল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার বাবা অন্তত ৫০ বছর খেজুর গাছ কেটেছেন। তার কাছ থেকে আমি শিখেছি। ভালো গুড় তৈরি করতে পারলে ভালো দাম পাওয়া যায়। এখন আর গুড় নিয়ে হাটে যেতে হয় না। মানুষ বাড়ি থেকেই কিনে নিয়ে যায়। গত মৌসুমে ৬০ হাজার টাকার গুড় বিক্রি করেছি।’
গ্রাম থেকে শহর, অনলাইনেও বাড়ছে বাজার
শীত মৌসুমে গাছিরা গাছ থেকে রস সংগ্রহের পর তা প্রক্রিয়াজাত করে গুড় তৈরি করেন। উৎপাদিত গুড় উপজেলার বিভিন্ন হাটে কেনাবেচা হয়। সেখান থেকে পাইকাররা কিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাট-বাজারে সরবরাহ করেন। এই গুড় দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে।
শুধু খোলা বাজারেই নয়, ই-কমার্সেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যশোরের খেজুর গুড় ও পাটালি। অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোক্তা দেশে-বিদেশে ভোক্তার ঘরে পৌঁছে দিচ্ছেন এসব পণ্য। ফলে সম্প্রসারিত হচ্ছে গুড়ের বাজার, তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান এবং বাড়ছে কৃষকের আয়।
সারা বছরই গাছিদের বাড়িতে গুড় পাওয়া গেলেও মূল শীত মৌসুমেই টাটকা ও নতুন গুড় পাওয়া যায়। এ সময়ের গুড়ের স্বাদও অন্য সময়ের তুলনায় আলাদা।
কৃষি অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোশাররফ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যশোরের খেজুর গুড় খুবই সুস্বাদু। তাই চাহিদা বেশি। প্রতি মৌসুমে দেড়শত কোটি টাকার রস ও গুড় বিক্রি হয়। যা কৃষি অর্থনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। নিরাপদ খেজুর রস ও গুড় উৎপাদনে কৃষকদের পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও উঠান বৈঠকে উদ্বুব্ধ করছে কৃষি বিভাগ। তাছাড়া গত পাঁচ বছরে ১০ শতাংশ রস-গুড়ের উৎপাদন বেড়েছে।’
চিনির বিকল্প হিসেবে শহরেও বাড়ছে চাহিদা
দেশের বাজারে চিনির বিকল্প পণ্য হিসেবে খেজুর গুড়ের চাহিদা বাড়ছে। বিশেষ করে শীতকালে খেজুরের রসের পাশাপাশি গুড়ের চাহিদাও বেড়ে যায়। একসময় খেজুরের রস ও গুড়ের বাজার মূলত গ্রামকেন্দ্রিক থাকলেও এখন অনেকেই চিনির বিকল্প হিসেবে গুড় ব্যবহার করছেন। ফলে কয়েক বছর ধরে শহরেও বাড়ছে খেজুর গুড়ের চাহিদা।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শীতকালে শহরে খেজুর গুড়ের বেশ চাহিদা থাকে। বাসাবাড়ির পাশাপাশি পাড়া-মহল্লা ও রাস্তার ধারে বসা পিঠার দোকানেও বেড়েছে খেজুর গুড়ের ব্যবহার। এ ছাড়া শহরের কোনও কোনও এলাকায় চায়ের দোকানেও চিনিমিশ্রিত চায়ের পাশাপাশি গুড়ের চা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এসব চায়ে অবশ্য আখের গুড়ের তুলনায় খেজুরের গুড়ের ব্যবহারই বেশি।
অর্থনীতির চালিকাশক্তি যশোরের পাটালি গুড়
‘যশোরের যশ, খেজুরের রস’- এই প্রবাদটি শত বছর ধরে গ্রামবাংলার লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে। শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গে জেলার চৌগাছা, ঝিকরগাছা, মণিরামপুর ও সদর উপজেলার গ্রামগুলোতে খেজুর রস ও পাটালি গুড় তৈরির মহোৎসব শুরু হয়। এটি কেবল একটি মৌসুমি খাদ্যপণ্যই নয়, বরং এ অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির এক নীরব চালিকাশক্তি।
উৎপাদন প্রক্রিয়া ও গাছিদের ব্যস্ততা
আশ্বিনের শেষ থেকে শুরু করে কার্তিকের শুরুতে গাছিরা ধারালো দা দিয়ে খেজুর গাছের বাঁকল কেটে রস আহরণের জন্য প্রস্তুত করেন, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘গাছ তোলা’ বলা হয়। শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে গাছ থেকে নামানো হয় মিষ্টি সোনালি রস।
গাছিরা জানান, সাধারণত ৭ থেকে ৮ লিটার খাঁটি রস জ্বাল দিয়ে ১ কেজি সুস্বাদু পাটালি গুড় তৈরি করা হয়। রস জ্বালানোর শেষ ধাপে এসে যখন এটি ঘন ও আঠালো হয়ে ওঠে, তখন বিশেষ ছাঁচে ঢেলে জমানো হয়। এই জমানো গুড়ই বাজারে পাটালি গুড় নামে সমাদৃত।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খেজুর গুড়ের বাজার ব্যাপক সম্প্রসারিত হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে যশোর জেলায় ৩ হাজার ৪০ মেট্রিক টন গুড় ও পাটালি বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। শীতের মাত্র ৩-৪ মাসে এই জেলা থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার গুড় ও পাটালি দেশ-বিদেশে সরবরাহ করা হয়, যা প্রান্তিক চাষি ও গাছিদের স্বাবলম্বী করে তুলছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি মাঠ পর্যায় থেকে খাঁটি গুড় শহুরে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
সংকটের মুখে ঐতিহ্য ও ভেজালের থাবা
অপার সম্ভাবনা সত্ত্বেও এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি এখন বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। নতুন করে খেজুর গাছ রোপণ না করায় এবং ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের কারণে গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। নতুন প্রজন্ম এই কঠোর পরিশ্রমের পেশায় আসতে আগ্রহী না হওয়ায় দক্ষ গাছির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।
বাজারে বেশি লাভের আশায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী চিনির সিরাপ বা কেমিক্যাল মিশিয়ে নকল পাটালি তৈরি করছে, যা আসল গুড়ের সুনাম নষ্ট করছে। খাঁটি পাটালি কিছুটা নরম ও গাঢ় বাদামি রঙের হলেও ভেজাল গুড়গুলো সাধারণত অতিরিক্ত শক্ত ও উজ্জ্বল ঝকঝকে হয়।