একদিকে পুলিশপ্রধানের সুধী সমাবেশ, অন্যদিকে যুবদল নেতাকে গুলি করলো সন্ত্রাসীরা

খুলনায় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরের বিশেষ সফর ও সুধী সমাবেশ চলাকালে জেলার তেরখাদা উপজেলায় রামিম বিশ্বাস নামে এক স্থানীয় যুবদল নেতা দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। 

সম্প্রতি খুলনায় একের পর এক হত্যা, গুলি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। এর মধ্যে পুলিশপ্রধান আইজিপির সফরকালেও সরকারদলীয় নেতাকে প্রকাশ্যে এমন গুলি করার ঘটনায় নতুন করে নেতাকর্মীসহ খুলনার লোকজনের মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইনসে বিভাগের কমিউনিটি পুলিশিং বিষয়ক সুধী সমাবেশে শনিবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত উপস্থিত ছিলেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির। এরই মধ্যে বেলা সোয়া ১১টার দিকে খুলনার তেরখাদায় সন্ত্রাসীরা মোটরসাইকেলে এসে এক যুবদল নেতাকে গুলি করে চলে যায়।

পারহাজী গ্রামের সেনেরবাজার-মধুপুর সড়কে খান ব্রিকসের কাছে এ ঘটনা ঘটে। গুলিতে মো. রামিম বিশ্বাস (৩২) নামে ওই যুবদল নেতা গুরুতর আহত হন। তার পাঁজরে গুলি লেগেছে। পরে তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। আহত রামিম বিশ্বাস তেরখাদা উপজেলার ৬ নম্বর মধুপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি। তিনি পারহাজীগ্রামের বাসিন্দা হাবিবুর রহমানের ছেলে।

পুলিশ জানায়, ঘটনার সময় রামিম পারহাজীগ্রামে আয়নাল মোল্লার বাড়ির সামনে একটি ভ্যানে অবস্থান করছিলেন। এ সময় মোটরসাইকেলে করে আসা অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা পেছন দিক থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে তার পাঁজরে গুলি লাগে। গুলি চালানোর পর দুর্বৃত্তরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। গুলির শব্দ শুনে স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। পরে তারা আহত রামিমকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। খবর পেয়ে তেরখাদা থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং ঘটনার আলামত সংগ্রহ করে। তবে কারা এ ঘটনায় জড়িত, তা এখনও নিশ্চিত করে জানাতে পারেনি পুলিশ।

খুলনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবির সিদ্দিকী শুভ্র বলেন, ‘ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে পুলিশ কাজ করছে। পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় পুলিশের নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। কী কারণে রামিম বিশ্বাসকে গুলি চালানো হয়েছে, কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত এবং এর পেছনে কোনও বিরোধ রয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে পুলিশের তদন্ত ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের কাজ করছে পুলিশ।’

সুধী সমাবেশ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইজিপি আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘চাঁদাবাজরা হয় সন্ত্রাসী অথবা কোনও না কোনও ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। ফলে নতুন আইনে জনগণের অভিযোগ ছাড়াই ডিজিটাল প্রমাণ বা অন্য কোনও সূত্র পাওয়া গেলে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত (সুয়োমোটো) মামলা করার সুযোগ পাবে পুলিশ।’

তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে বল প্রয়োগ করলে পুলিশকে ফ্যাসিবাদী বলা হয়, আর বল প্রয়োগ না করলে দুর্বল মনে করা হয়। গত ১৭ বছরে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সমাজে মাদককে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। এ পরিস্থিতি নিরসনে কাজ করছে পুলিশ।’

পুলিশের মহাপরিদর্শক বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কার্যকর করতে স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কমিউনিটি পুলিশিং পুলিশের একটি শাখা হিসেবে কাজ করবে। কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও মাদক নিয়ন্ত্রণে দেশব্যাপী যৌথ অভিযান চলছে। পাশাপাশি চাঁদাবাজির অভিযোগে জনগণের অভিযোগ ছাড়াই পুলিশের স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা করার ক্ষমতা দিতে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে আইজিপি বলেন, ‘কিছু অপরাধী খুন হচ্ছে, আবার কিছু অপরাধী খুন করছে। জনগণের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে কেউ বলছে—বল প্রয়োগ করা হোক। বল প্রয়োগ করলে বলা হয়, পুলিশ ফ্যাসিস্ট। বল প্রয়োগ না করলে বলা হয়, পুলিশ দুর্বল। সুতরাং এগুলো আমরা দেখতে চাই না। সবাই মিলে একটি কার্যকরী পুলিশ বাহিনীর মাধ্যমে সমাজের শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য, দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য কাজ করতে হবে।’  

গুলির ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে তেরখাদা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কবির আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‌‌‘গুলিবিদ্ধ যুবদল নেতা আশঙ্কামুক্ত। তার চিকিৎসা চলছে। মাদক বিরোধের জেরে এই ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।’ 

আইজিপির সফরকালেও এমন ঘটনা নিয়ে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, এ ব্যাপারে পরিদর্শক (তদন্ত) কবির আহমেদ বলেন, ‘খুলনায় আইজিপির সুধী সমাবেশে আমাদের থানার ওসিও ছিলেন। আর সমাবেশস্থল থেকে গুলির ঘটনাস্থল ১৫ কিলোমিটার দূরত্বে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোনও ভিন্ন।’