সারা দেশে শারদীয় দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে ২১ অক্টোবর। তবে যশোর সদর উপজেলার কৈখালী সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরে হয়েছে ব্যতিক্রমী আয়োজন। প্রথম দফায় পূজা শেষে প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতির সময় এক নারীর অস্বাভাবিক আচরণ ও পূজায় ত্রুটি থাকার দাবিকে কেন্দ্র করে নতুন করে পূজার আয়োজন করেন আয়োজকেরা। শনিবার (২৪ অক্টোবর) দ্বিতীয় দফায় বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিকালে ভৈরব নদে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় আয়োজন।
মন্দিরের আয়োজক ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত বুধবার বিজয়া দশমীর দিন বিকালে প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি চলছিল। এ সময় সবিতা রাণী ঘোষ নামে এক নারী প্রতিমার সামনে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে তিনি অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকেন। একপর্যায়ে তার ওপর দেবী দুর্গা ভর করেছেন বলে দাবি করেন তিনি। তার বক্তব্য ছিল, অশৌচ থাকা ব্যক্তিরা পূজায় অংশ নিয়েছেন এবং পুরোহিত মাছ-মাংস খেয়ে পূজা করেছেন। এ কারণে পূজা যথাযথভাবে হয়নি। অমঙ্গল এড়াতে ও গ্রামের কল্যাণে আবার পূজা করতে হবে। তার কথিত দৈববাণী অমান্য করলে গ্রামে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলেও জানান তিনি।
মন্দির প্রাঙ্গণে উপস্থিত লোকজন এ ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। পরে প্রতিমা বিসর্জন স্থগিত রেখে নতুন পুরোহিতের মাধ্যমে আবার পূজার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আয়োজকদের ভাষ্য, প্রথম দফার নিয়ম অনুসরণ করে দ্বিতীয় দফায় মহাষষ্ঠী থেকে মহানবমী পর্যন্ত পূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। শনিবার সকালে বিজয়া দশমীর ঘটপূজা ও সিঁদুরদানের পর বিকালে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়।
কৈখালী সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক গণেশ কুমার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত ১৬ অক্টোবর থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশের মতো এই মন্দিরেও দুর্গাপূজা হয়েছে। ২১ অক্টোবর বিকালে প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। বিভিন্ন পূজা শেষে নারীরা সিঁদুর খেলাও শুরু করেন। এ সময় সবিতা রাণী ঘোষ অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করেন। জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তাকে চোখে-মুখে পানি দিয়ে জাগিয়ে তুলি।’
গণেশ কুমার আরও বলেন, ‘এরপর ওই নারী দেয়ালে মাথা ঠুকতে ঠুকতে বলতে শুরু করেন, এই মন্দিরে দুর্গাপূজায় ত্রুটি ছিল। সঠিকভাবে পূজা হয়নি। অশৌচ থাকা লোকজন পূজায় অংশ নিয়েছেন। একই সঙ্গে পুরোহিত মাছ-মাংস খেয়ে পূজা করেছেন। এ জন্য মায়ের পূজা সঠিকভাবে হয়নি। পুনরায় পূজা না করলে গ্রামবাসীর বড় ধরনের ক্ষতি হবে।’
মন্দিরের সাধারণ সম্পাদকের ভাষ্য, ঘটনার আগের রাতে এলাকার কয়েকজন মানুষ নড়াইলে পূজা দেখতে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় পড়েন। তারা আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। সবিতা রাণী ঘোষের বক্তব্যের পর অশৌচ থাকা ব্যক্তিদের খোঁজ নিয়ে তাদের পূজায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি জানা যায় বলে দাবি করেন তিনি। এলাকায় দুর্ঘটনার ঘটনাটিও সামনে আসায় মন্দির প্রাঙ্গণে উপস্থিত লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এরপর তারা পুনরায় পূজার সিদ্ধান্ত নেন। প্রতিমা বিসর্জন স্থগিত রেখে শুক্রবার ও শনিবার সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমীর পূজার আয়োজন করা হয়।
যশোর শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে কৈখালী গ্রাম। স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা শত বছরের বেশি সময় ধরে সেখানে দুর্গাপূজার আয়োজন করে আসছেন। শনিবার দুপুরে মন্দির প্রাঙ্গণে ভিড় করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
মন্দিরের সভাপতি মিলন কুমার রায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শত বছরের বেশি সময় ধরে দুর্গাপূজার আয়োজন হলেও এবার ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেছে। খরচ বেশি হলেও সবার মঙ্গলের জন্য ফের পূজার আয়োজন করা হয়েছে। মানুষের মধ্যে একধরনের শঙ্কা ও আতঙ্ক ছিল। তবে সব বিতর্ক ছাপিয়ে দেবী দুর্গাকে নতুন করে পূজা করা হয়েছে। বিসর্জনের মাধ্যমে দেবী ভুলত্রুটি ক্ষমা করে পাড়ার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শান্তিতে ভরিয়ে দেবেন, এমনটাই আশা।’
মন্দিরের পুরোহিত উজ্জ্বল কুমার চ্যাটার্জী বলেন, ‘শাস্ত্রে দ্বিতীয় দফায় দুর্গাপূজার নিয়ম না থাকলেও এলাকার মানুষের মঙ্গল কামনায় ঘট স্থাপন করে ফের পূজার আয়োজন করা হয়। দেবীর তুষ্টি আর গ্রামের সার্বিক কল্যাণের আশায় শনিবার বিকালে ধর্মীয় আচার মেনে ভৈরব নদে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে।’
ঘটনাটিকে ব্যতিক্রমী বলে উল্লেখ করেছেন জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তপন কুমার ঘোষ। তিনি বলেন, ‘অলৌকিক ঘটনার দাবিকে কেন্দ্র করে কৈখালী গ্রামে দুই দফায় দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নিজেদের বিশ্বাস থেকে এলাকার মানুষের মঙ্গল কামনায় এ পূজা করেছেন।’