উপকূলে লবণাক্ততায় কমছে ধানের ফলন, সংকটে চিংড়ি চাষও

খুলনার উপকূলীয় জনপদে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর শুধু নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় কিংবা জলোচ্ছ্বাসে সীমাবদ্ধ নেই। এর অভিঘাত পড়ছে কৃষিজমি, মৎস্য উৎপাদন, মানুষের জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তায়। কোথাও অতিরিক্ত লবণাক্ততায় চিংড়ি চাষও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। কোথাও মাটির উর্বরতা কমে ধানসহ অন্যান্য ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আবার যেসব জমিতে মিষ্টি পানির ব্যবস্থা করা সম্ভব হচ্ছে, সেখানে ধান, সবজি ও অন্যান্য ফসল চাষে ভালো ফলন পাচ্ছেন কৃষকেরা। তাই উপকূলের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা দেখছেন তারা।

পাইকগাছা উপজেলার মাহমুদকাঠির কৃষক সাইদ মোড়ল এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। তার জমিতে মিষ্টি পানি থাকলেও ধীরে ধীরে লবণাক্ততা বাড়ছে। তিনি বলেন, বর্তমানে এক বিঘা জমিতে ধান চাষে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। ফলন হয় ১৬ মণ, প্রতি মণ বিক্রি হয় এক হাজার টাকায়। গত ১০ বছরে জমিতে লবণাক্ততা বেড়েছে। ২০১৫ সালে কপোতাক্ষ নদের বাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হওয়ার পর থেকে এ সমস্যা বাড়তে শুরু করে। আগে বিঘাপ্রতি ১৮ থেকে ২০ মণ ধান পাওয়া গেলেও এখন ফলন কমে গেছে।

একই উপজেলার কলাবাগানমালিক আবদুল কাদের মোড়ল বলেন, ১০ বছর আগে তার জমিতে লবণাক্ততা ছিল না। সব ধরনের ফসল হতো। এখন লবণের কারণে কোনো ফসলই ভালো হয় না। জমি পতিত না রেখে সেখানে কলাগাছ লাগিয়েছেন। কিন্তু লবণাক্ততার কারণে গাছ বাড়ছে না, কলাও বড় হচ্ছে না।

লবণাক্ততা বাড়ছে, কমছে মাটির উৎপাদনক্ষমতা

খুলনার দাকোপ, কয়রা, পাইকগাছা ও বটিয়াঘাটা অঞ্চলের কৃষি ও মৎস্যসম্পদ জলবায়ু পরিবর্তন, পানির লবণাক্ততা এবং জমির ব্যবহার পরিবর্তনের সম্মিলিত চাপে রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, শুষ্ক মৌসুমে উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাস উপকূলের মাটি ও পানির লবণাক্ততা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। তবে সব এলাকার পরিস্থিতি এক নয়। নদী, বাঁধ, বৃষ্টিপাত, জমির উচ্চতা ও স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে লবণাক্ততার প্রভাব।

২০০৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার মাটি ও নদীর পানির তথ্য বিশ্লেষণ করে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততা বাড়ে। বর্ষায় বৃষ্টিপাত ও মিঠাপানির প্রবাহের কারণে তা কমে। ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাসে বাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানি ঢুকলে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে পারে।

লবণাক্ততার এই চক্র কৃষকদের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। বর্ষায় জমিতে ধান চাষের সুযোগ থাকলেও শীত ও গ্রীষ্মে পর্যাপ্ত মিঠাপানি না থাকায় অনেক জমি অনাবাদি পড়ে থাকে। কোথাও একটি ফসলের পর আরেকটি ফসল উৎপাদনের সুযোগও সীমিত হয়ে যায়। ফলে জমি থাকা সত্ত্বেও সারা বছর তা থেকে আয় করতে পারেন না কৃষকেরা।

পাইকগাছার নোয়াকাঠির কৃষক মো. ইউনুস গাজী বলেন, হারিয়া নদের পাশে তার নিজের আট বিঘাসহ ১৩ বিঘা জমিতে ঘের রয়েছে। বছরের সাত থেকে আট মাস জমিতে লবণাক্ত পানি থাকে। এ কারণে সেখানে কোনও ফসল হয় না। বাধ্য হয়ে বাগদা চিংড়ি চাষ করছেন তারা। প্রায় ৩০ বছর ধরে এ জমিতে ঘের করতে হচ্ছে।

ইউনুস গাজী বলেন, শুষ্ক মৌসুমে শুধু বোরো ধান চাষ করা যায়। সে জন্য লবণাক্ত পানি সরিয়ে মিষ্টি পানি জোগাড় করতে হয়। চিংড়ি চাষে বিঘাপ্রতি ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হলেও আয় হয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা। অতিরিক্ত লবণাক্ততায় চিংড়ি মারাও যায়। 

অন্যদিকে, ধান চাষের জন্য লবণাক্ত পানি সরিয়ে মিষ্টি পানি আনতে খরচ বাড়ে। আগে এ জমিতে বছরে দুইবার ধান হতো, খরচও কম ছিল। এখন লবণাক্ততার কারণে জমির উর্বরতা ও উৎপাদন কমেছে।

স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ তুলে ইউনুস গাজী বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে লবণাক্ততা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। তার অভিযোগ, দলীয় লোকজনের প্রভাবেই স্লুইসগেট খুলে লবণাক্ত পানি ঢোকানো হয়। তিনি নিজের জমিতে পানি না তুললেও পাশের জমি থেকে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়ে।

নোয়াকাঠির মিজানুর রহমান বলেন, লবণাক্ততার কারণে জমিতে ফসল হয় না। চিংড়ি চাষ করা গেলেও লবণ বেড়ে যাওয়ায় ভালো উৎপাদন পাওয়া যায় না। তারা ধান, সবজি ও গাছপালায় ভরা সবুজ পরিবেশ চান। কিন্তু লবণাক্ততার কারণে বাধ্য হয়ে ঘের করতে হচ্ছে।

একই এলাকার কামরুল ইসলামের হারিয়া ও গোনখালি নদের পাশে দুই বিঘা জমি রয়েছে। তিনি বলেন, ৩০ বছর আগে ওই জমিতে সব ধরনের ফসল হতো। এখন লবণাক্ততার কারণে ঘের করতে হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে মিষ্টি পানি তুলে ধান চাষ করলেও লবণাক্ততা কমাতে খরচ বাড়ে, ফলে ধানে লাভ কম হয়। চিংড়ি চাষেও আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি।

মাটির উর্বরতা কমে যাওয়াও বড় উদ্বেগের বিষয়। মাটিতে অতিরিক্ত লবণ জমলে গাছের শিকড়ের পক্ষে পানি গ্রহণ কঠিন হয়। বীজের অঙ্কুরোদ্গম, চারার বৃদ্ধি ও পুষ্টি উপাদান গ্রহণ ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে মাটিতে জৈব পদার্থের স্বল্পতা ও পুষ্টির ভারসাম্যহীনতা উৎপাদনক্ষমতা কমিয়ে দেয়। দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মাটি ও পানি নিয়ে প্রকাশিত গবেষণায় কয়েকটি এলাকায় জৈব পদার্থ ও মোট নাইট্রোজেনের স্বল্পতা এবং সেচের পানির মান নিয়ে উদ্বেগের তথ্য পাওয়া গেছে।

একসময় খুলনার উপকূলীয় অর্থনীতিতে চিংড়ি চাষ ছিল গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস। তবে লবণাক্ততা বাড়লেই চিংড়ির উৎপাদন বাড়বে, এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। চিংড়ি ও বাগদা চাষের জন্য পানির নির্দিষ্ট মান, উপযুক্ত তাপমাত্রা, অক্সিজেন এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। লবণাক্ততার আকস্মিক পরিবর্তন, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, দূষণ ও পানির গুণগত অবনতিতে চিংড়ির বৃদ্ধি ও বেঁচে থাকার হার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

খুলনা অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চিংড়ি উৎপাদনের ঝুঁকি, বন্য পরিবেশে চিংড়ির প্রজননক্ষমতা কমে যাওয়া এবং তাপমাত্রার পরিবর্তন নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। লবণাক্ততা কম হলে কিছু প্রজাতির চিংড়ি চাষের পরিবেশ অনুকূল থাকে না। আবার অতিরিক্ত বা অস্থিতিশীল লবণাক্ততায় উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে পানির মান বুঝে চাষের সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আধুনিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে।

লবণাক্ততার দ্বিমুখী সংকট, মিঠাপানিতে ফিরছে কৃষির আশা

এ ছাড়া চিংড়ি চাষের জন্য জমিতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করানো হয়। পানি নিষ্কাশন ও জমি ব্যবস্থাপনা যথাযথ না হওয়ায় আশপাশের কৃষিজমিতেও লবণাক্ততার চাপ বাড়তে পারে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি জমির ব্যবহার, ঘের ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় পানি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।

মিষ্টি পানিতে কৃষির সম্ভাবনা

উপকূলের সব জায়গায় কৃষির ভবিষ্যৎ যে অনিশ্চিত, তা নয়। যেখানে বর্ষার পানি ধরে রাখা যায়, খাল ও পুকুরে মিঠাপানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় এবং সেচের ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে কৃষির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। মিঠাপানির সুবিধা থাকলে কৃষকেরা ধান ও পাটের পাশাপাশি শীতকালীন সবজি, ডাল, তেলবীজসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করতে পারেন। তবে কোন এলাকায় কোন ফসল লাভজনক হবে, তা নির্ভর করে মাটির লবণাক্ততা, পানির প্রাপ্যতা, বীজের বৈশিষ্ট্য, বাজারদর ও উৎপাদন খরচের ওপর।

হেতামপুরের কৃষক আবদুস সালাম বলেন, মিঠাপানির এ এলাকার মাঠে তার চার বিঘা জমি রয়েছে। সেখানে ধান, পাট ও সরিষা মিলিয়ে বছরে চারটি ফসল হয়। মিঠাপানির কারণে ফলন ভালো হয়। বিঘাপ্রতি ধান পাওয়া যায় ১৬ থেকে ১৮ মণ। ধান চাষে বিঘাপ্রতি চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়। সরিষা চাষে খরচ তুলনামূলক কম, তবে বিঘাপ্রতি পাঁচ থেকে ছয় মণ সরিষা পাওয়া যায়।

একই এলাকার আনসার আলী সরদার বলেন, এ মাঠে তার ১০ কাঠা জমি। এবার পাটের মৌসুমে পাটগাছ শুয়ে পড়েছিল। ফলে সোয়া দুই মণ পাট পেয়েছেন। পাট চাষে তার খরচ হয়েছিল ১ হাজার ২০০ টাকা।

কৃষক জিনারুল ইসলাম সাড়ে ১৮ কাঠা জমিতে ধান চাষ করেছেন। তিনি বলেন, এবার ধানে শীষকাটা পোকার আক্রমণ দেখা দেওয়ায় কীটনাশক দিতে হচ্ছে। এতে কিছুটা খরচ বাড়বে, তবে ধানের ফলন ভালো হবে বলে আশা করছেন তিনি।

বাংলাদেশের উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলে ফসলের নিবিড়তা বাড়ানোর বিষয়ে কৃষি গবেষণায় শীতকালীন ফসল, উপযুক্ত বপন সময় ও পুকুর গভীর করে পানি সংরক্ষণের সম্ভাবনা মূল্যায়ন করা হয়েছে। ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় পানি সংরক্ষণ ও ফসল ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগকে অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় অভিযোজন কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এ ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, খাল পুনঃখনন, পুকুরের পানি সেচের উপযোগী রাখা, লবণসহিষ্ণু ফসলের জাত ব্যবহার এবং মাটিতে জৈব পদার্থ বাড়ানোর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি মাটি ও পানির লবণাক্ততা নিয়মিত পরীক্ষা করে ফসল নির্বাচন ও সেচের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

গবেষণায় লবণাক্ততার বিস্তার

গত এক দশকের পরিস্থিতি নিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে লবণাক্ততা বিষয়ে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) ২৮ জুলাই ২০২৬ প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে উপকূলীয় সমীক্ষা এলাকার মূল্যায়ন করা ১৭ লাখ ৩ হাজার হেক্টর চাষযোগ্য জমির মধ্যে প্রায় ১১ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর বা ৬৭ দশমিক ৯ শতাংশ জমি লবণাক্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ২০০৯ সালের তুলনীয় পরিসংখ্যান ছিল ১০ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর। অর্থাৎ ১৫ বছরে লবণাক্ত চাষযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ৯৯ হাজার ৮০০ হেক্টর বা ৯ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে।

২০২৫-২৬ সালে সায়েন্টিফিক রিপোর্টস-এ প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে ২০০৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত এসআরডিআইয়ের মাসিক তথ্য ব্যবহার করা হয়। এতে ১১টি স্থানের মাটি এবং ১৩টি নদী স্টেশনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় মাটির লবণাক্ততার গড় রৈখিক পরিবর্তন বছরে প্রায় ১৭৬ মাইক্রোসিমেন্স/সেন্টিমিটার এবং নদীর পানির ক্ষেত্রে বছরে ৯৩ মাইক্রোসিমেন্স/সেন্টিমিটার হ্রাসের প্রবণতা দেখা গেছে। তবে খুলনার কৃষ্ণনগরে ২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত হ্রাসের পর ২০১৪ থেকে ২০২২ সালে আবার বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যায়। ২০১৪ সাল থেকে সেখানে শুষ্ক মৌসুমে মাটির লবণাক্ততা বেড়েছে। মার্চ থেকে মে মাসে লবণাক্ততার নিয়মিত ওঠানামা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।

ঘূর্ণিঝড় ফণী, বুলবুল, আম্পান ও ইয়াস পানি অবকাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে এবং স্বল্পমেয়াদি লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণার জন্য মার্চ মাসে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৬২টি উপরিভাগের মাটির নমুনা সংগ্রহ এবং রেমাল-পরবর্তী পরিস্থিতি ও বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত তথ্যও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

এসআরডিআইয়ের বার্ষিক প্রতিবেদনে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় লবণাক্ততায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০০৯ সালে খুলনায় প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার, সাতক্ষীরায় ১ লাখ ৫৩ হাজার এবং বাগেরহাটে ১ লাখ ৩১ হাজার হেক্টর—সব মিলিয়ে প্রায় ৪ লাখ ৩২ হাজার হেক্টর চাষযোগ্য জমি লবণাক্ততার প্রভাবে ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

খুলনার দাকোপ, কয়রা, পাইকগাছা ও বটিয়াঘাটা; রূপসা, শিবসা ও পশুর নদীসংলগ্ন এলাকা; সাতক্ষীরার শ্যামনগর, গাবুরা ও আশাশুনি; কপোতাক্ষ নদ করিডোর এবং বাগেরহাটের মোংলা, রামপাল, শরণখোলা ও সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে জোয়ারের প্রভাব, পোল্ডারের গেট ব্যবস্থাপনা, বাঁধভাঙন ও লবণাক্ত ঘেরের কারণে উদ্বেগ রয়েছে। এসব এলাকায় মিঠাপানি সংরক্ষণ ও পানীয় জলের প্রাপ্যতাও সীমিত।

অত্যন্ত লবণাক্ত নদীর কারণে সেচের সীমাবদ্ধতা বাড়ছে। চিংড়িঘেরে পানি সরবরাহের পাইপ নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধের তথ্য রয়েছে। জোয়ারের লবণাক্ততা, মিঠাপানির অভাব এবং পোল্ডারের দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

এর প্রভাবে ধানের চারা ও বিকল্প ফসল চাষ ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সুপেয় পানির সংকটও রয়েছে। পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে নারীদের স্বাস্থ্যগত উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষি, সুপেয় পানি ও ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের ওপর চাপ বাড়ছে এবং ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় প্রাকৃতিক প্রতিরোধব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জোয়ারের টানে বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ত পানি উজানে প্রবাহিত হয়। অন্যদিকে বর্ষার বৃষ্টি ও নদীর পানিপ্রবাহ তা ভাটির দিকে নিয়ে যায়। সাধারণত নভেম্বর থেকে মে পর্যন্ত কম বৃষ্টিপাত ও বেশি বাষ্পীভবনের কারণে লবণাক্ততা ঘনীভূত হয়। নদী ও মাটির বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা (ইসি) প্রায়ই এপ্রিল-মে মাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ফারাক্কা ব্যারাজ ও উজানে পানি উত্তোলন ঐতিহাসিকভাবে গড়াই-মধুমতি ব্যবস্থায় শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার প্রবাহ কমার পেছনে ভূমিকা রেখেছে, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানি সরবরাহ করে।

যা বলছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর খুলনার উপপরিচালক নজরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‌‘খুলনার কৃষিতে জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার প্রভাব অত্যন্ত তীব্র। ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ুর কারণে এ উপকূলীয় জেলায় ভূমির পরিবর্তন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্ত সোডিয়ামের উপস্থিতিতে মাটির ভৌত ও রাসায়নিক গঠন নষ্ট হয়। ফলে গাছ মাটি থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও পানি শোষণ করতে পারে না। জমিতে লবণের মাত্রা বেশি হলে বীজের অঙ্কুরোদ্গম কমে এবং চারার বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।’

তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত লবণাক্ততায় অনেক জাতের ধানের ফলন কমেছে এবং কিছু এলাকায় চাষ বন্ধ হয়ে গেছে। লবণাক্ত পানি প্রবেশ ও পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে বহু ধানিজমি লবণাক্ত পানির চিংড়িঘেরে রূপান্তরিত হয়েছে। বিশেষ করে মার্চ থেকে মে মাসে নদী-নালা ও ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা চরমে পৌঁছায়। লবণাক্ততায় মাটির উপকারী অণুজীব ও কেঁচোর কার্যকারিতা কমে যায়, যা মাটির প্রাকৃতিক সজীবতা নষ্ট করে।’

একসময় লবণাক্ততার কারণে শুষ্ক মৌসুমে হাজার হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি পড়ে থাকতো। বর্তমানে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা ও ড্রিপ সেচপ্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষকেরা নিজেদের খাদ্যের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি তরমুজ, টমেটো, মিষ্টিকুমড়াসহ বিভিন্ন সবজি বাজারে বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন বলে জানান নজরুল ইসলাম।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, খুলনা জেলার মোট আবাদি জমির প্রায় ৫৭ শতাংশ কোনও না কোনও মৌসুমে—বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে—মাঝারি থেকে তীব্র লবণাক্ততায় আক্রান্ত হয়। অন্যদিকে, প্রায় ৪৩ শতাংশ জমিতে মিঠাপানির কৃষি সম্ভব।