সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের হাওলাদার বাড়ির জলোচ্ছ্বাসের ফলে সৃষ্ট খালপাড়ের ছোট এক খুপরি ঘরের সামনে চুপচাপ বসে থাকেন সত্তরোর্ধ্ব শাহজাহান ও তার ষাটোর্ধ্ব স্ত্রী রাবেয়া বেগম। চারিদিকে শুধু বিশাল জলরাশি। কিন্তু লবণাক্ততার কারণে সে কোনও কাজেই লাগে না। জীর্ণ আশ্রয়ে বসে এই জলরাশির পানে চেয়ে থাকেন রাবেয়া বেগম, পাশে বার্ধক্যে নুয়ে পড়া তার স্বামী।
একসময় এই বাড়িতে শাহজাহান-রাবেয়া দম্পতির ছিল কানায় কানায় ভরা সংসার। দুই বিঘা জমির সবুজ আমবাগান, ধানক্ষেত আর পরিপাটি বসতঘর আর সবকিছু নিয়েই ছিল আনন্দময় জীবন।
কিন্তু ২০২০ সালের মে মাসে সবকিছু তছনছ করে দিয়ে যায় সুপার সাইক্লোন ‘আম্পান’। প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুঁড়িকাহুনিয়া ও হাওলাদার বাড়ি সংলগ্ন বাধ ভেঙে খোলপেটুয়া আর কপোতাক্ষের নোনা জল ঢুকে অল্প সময়ের মধ্যে ভাসিয়ে নিয়ে যায় তাদের বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা স্বপ্নের সংসার। টানা কয়েক বছর ধরে ঘরবাড়িতে চলেছে নিয়মিত জোয়ার-ভাটা। ভিটেমাটি, ফসলি জমি থেকে শুরু করে মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু গ্রাস করেছে প্রমত্তা খোলপেটুয়া।
আম্পান তাদের কাছ থেকে শুধু ঘরবাড়ি, আমবাগান আর ফসলি জমিই কেড়ে নেয়নি; কেড়ে নিয়েছে স্বজনদের সান্নিধ্যও। নদীভাঙন আর নোনা পানির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবে ভিটেমাটি হারিয়ে কাজের খোঁজে এলাকা ছেড়েছে তাদের জোয়ান ছেলেরা, সঙ্গে নিয়ে গেছে পোতা-পুত্নিদের হুমায়ুন কবির, মরিয়াম আর আফরোজাকেও। অসুস্থ রাবেয়া বেগম অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, পোতা-পুতনিদের জন্য খারাপ লাগবে না? কষ্ট হয় না? কিন্তু কি করবো, কাজের খোজে তারা দুরে চলে গেছে কিন্তু এই বয়সে আমরা কোথায় যাবো? অথচ আগে সবকিছু ছিল, স্বজনেরা ছিল, এখন কেউ নেই। মাসের পর মাস একা একা রান্না-বাড়া করি।
একাকী জীবনের সঙ্গী প্রবীণ শাহজাহান আলী দীর্ঘশ্বাস ফেলে আক্ষেপ করে বলেন, ‘ওর বাপের (রাবেয়া) প্রায় তিন-চার শত বিঘা জমি ছিল। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো সেই মেয়ে আজ নোনা জলের তোড়ে নিঃস্ব। অসুস্থতার কারণে এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারি না। ছেলে যেটুকু দেয়, তাতে সংসার চলে না; খেয়ে না-খেয়ে দিন কাটে। ক’দিন আগে বাজারে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম, অন্য লোকেরা বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেছে। কি আর করবো, এই একাকী জীবন আর ভালো লাগে না। এখন শুধু মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি।’
রাবেয়া-শাহজাহান দম্পতির এই গল্প কেবল কোনও একক পরিবারের করুণ কাহিনি নয়; এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের হাজার হাজার বিলুপ্তপ্রায় পরিবারের এক বিষাদময় বাস্তবতা।
জলবায়ু সংকট ও মাটিতে লবণক্ততা
পরিবেশ গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের বর্তমান সংকটের মূলে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদী অভিঘাত। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ধারাবাহিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রভাব। এসব কারণে এঅঞ্চলের মাটির উর্বরতা ও মিষ্টি পানির উৎসগুলো ক্রমান্বয়ে লবণাক্ত হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের ‘মাটির লবণাক্ততা মানচিত্র ২০২৪’-এর তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় অঞ্চলের ১৭ লাখ ৩ হাজার ৭৫৯ হেক্টর আবাদযোগ্য জমির মধ্যে ১১ লাখ ৫৫ হাজার ৯৮০ হেক্টর জমি মারাত্মক লবণাক্ত হয়ে পড়েছে (প্রায় ৬৮ শতাংশ)।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) সাতক্ষীরা আঞ্চলিক কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শামসুন নাহার রত্না এ বিষয়ে উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘সাধারণত বর্ষা মৌসুমে লবণাক্ততার তীব্রতা কম থাকে। তবে শুষ্ক মৌসুমে—বিশেষ করে নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে শুরু করে জুন মাস পর্যন্ত মাটির ও পানির লবণাক্ততা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ২০১৯ সালে সাতক্ষীরার খোলপেটুয়া নদীতে লবণাক্ততার মাত্রা যেখানে ২২ থেকে ২৫ ডেসিসিমেন্স/মিটার ছিল, ২০২৬ সালে তা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে সর্বোচ্চ ৫০ থেকে ৫৫ ডেসিসিমেন্সে পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পুরো উপকূলীয় পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।’
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, উজানের নদীর প্রবাহ ও নাব্যতা হ্রাস পাওয়ার কারণে সাগরের নোনা পানি ভেতরে চলে আসছে। এর পাশাপাশি অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ অঞ্চলের মাটির তলদেশ থেকে লবণাক্ত পানি উপরের স্তরে উঠে আসছে। এর ফলে কৃষিজমিতে একাধিক ফসল ফলানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে, যা কৃষকদের মাছ বা চিংড়ি ঘেরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর ফলে অন্যান্য কৃষিজ উৎপাদন হুমকির মুখে পড়বে।
জাতীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্থানান্তরের রূপরেখা
ভৌগোলিক নাজুকতার কারণে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত বন্যা, তীব্র ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও দ্রুত বিস্তারমান লবণাক্ততার মুখোমুখি হচ্ছে। নাজুক সামাজিক কাঠামোর কারণে এসব দুর্যোগ প্রাণহানি ও অবকাঠামো ধ্বংসের পাশাপাশি লাখ লাখ মানুষকে ভিটেমাটি হারিয়ে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য করছে। সরকারি হিসাবে কেবল ২০২০ সালের সুপার সাইক্লোন আম্পানের সময়েই দেশের উপকূলীয় এলাকার প্রায় ২৫ লাখ মানুষকে ঘর ছাড়তে হয়েছিল।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এবং বাংলাদেশ সরকারের তথ্যে দেখা গেছে, বন্যা, নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশের ভেতরেই বর্তমানে ৪৯ লাখ ৬০ হাজার মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। আর বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে সতর্ক করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দ্রুত টেকসই পদক্ষেপ না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ জলবায়ু-অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ছুয়ে ফেলবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের একক বৃহত্তম মানবিক ও সামাজিক প্রভাব হতে যাচ্ছে এই ‘বাস্তুচ্যুতি ও অভিবাসন’। সাতক্ষীরার গাবুরা বা প্রতাপনগর থেকে ভিটেমাটি হারিয়ে সাতক্ষীরা পৌরসভার বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলো মূলত এই বৈশ্বিক ও জাতীয় সংকটেরই প্রত্যক্ষ শিকার।
জেলা শহরে বাড়ছে বাস্তুচ্যুত মানুষের চাপ ও বস্তিতে মানবেতর জীবন
সাতক্ষীরা পৌরসভা ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘উত্তরণ’-এর যৌথ সমীক্ষা অনুযায়ী, পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে জেলা শহরে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
সমীক্ষার তথ্যমতে, সাতক্ষীরা পৌরসভায় ২২ বছরে প্রকৃতিক দুযোর্গের কারনে ১০ হাজার ১৩৩টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। এদের মধ্যে ৮৪ শতাংশই নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও তীব্র লবণাক্ততার শিকার হয়ে ভিটেমাটি হারিয়ে শহরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। বিশেষ করে ২০০০ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যবর্তী দশকে সবচেয়ে বেশি স্থানান্তর ঘটে, যা শহরটির ৯ নম্বর ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন বস্তিতে ঘনবসতি তৈরি করেছে। নোনা জল আর নদী ভাঙনের হাত থেকে বাঁচতে শহরে আসা এই জলবায়ু উদ্বাস্তুরা বর্তমানে অপরিসর কাঁচা ঘর, নোংরা ও প্লাবিত রাস্তাঘাট এবং ভঙ্গুর স্যানিটেশন ব্যবস্থার মধ্যে বস্তিতে চরম মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন।
গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী তরুণরা ও অভিবাসনের চিত্র
আইলা ও আম্পানের মতো একের পর এক আঘাত এবং তীব্র লবণাক্ততাই এই অভ্যন্তরীণ স্থায়ী ও অস্থায়ী অভিবাসনের মূল অনুঘটক। আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘রিসার্চগেট’ ও ‘গ্লোবাল এনভারমেন্টাল চেঞ্জ’-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগর ও কয়রা অঞ্চল থেকে প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পরিবার স্থায়ীভাবে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়েছে। অন্যদিকে, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (SRDI) সমীক্ষা বলছে, উপকূলীয় এলাকার প্রায় ৬২ শতাংশ জমি ক্ষতিকর লবণাক্ততায় আক্রান্ত হওয়ায় সনাতন কৃষি সম্পূর্ণ ব্যহত হয়েছে, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন ও শহরমুখী অভিবাসনের পথ বেছে নিতে বাধ্য করছে।
নোনা জলের দীর্ঘশ্বাস ও নারীর জীবন
আশাশুনির হাওলাদার বাড়ির দৃশ্যপট যেমন করুণ, প্রতিবেশী শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নের বাস্তবতাও সমান নিষ্ঠুর। উপকূলীয় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানীয় জলের হাহাকার এবং মারাত্মক লবণাক্ততা এখানকার নারীদের জীবনকে চরম বিপন্ন করে তুলেছে।
গাবুরার ৬০ বছর বয়সী ফজিলা খাতুন তাদেরই একজন। স্বামী হারা এই নারী পক্ষাঘাতগ্রস্ত । ছেলেমেয়েরা কাজের সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে। অসুস্থ শরীরে চরম কষ্টে কষ্টে দিন কাটে এই নারীর।
ফজিলা খাতুন জানান, আগে আমরা কৃষিকাজ করে খেতাম, কিন্তু এখন চতুর্দিকে শুধু লবণ আর লবণ। ধান চাষ তো দূরের কথা, একটা শাকসবজির গাছও বাঁচে না। খাবার পানির জন্য আমাদের মাইলকে মাইল হাঁটতে হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই অদৃশ্য ক্ষতি সামাজের বিভিন্ন জাতী গোষ্ঠী, বয়স ভিত্তিক নারী ও পুরুষের ওপর ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেলছে। যেমন-পুরুষেরা কাজের সন্ধানে এলাকা ছাড়ায় নারীদের ওপর পারিবারিক দায়িত্ব ও একাকীত্বের বোঝা বহুগুণ বেড়ে গেছে। অন্যদিকে, চেনা জীবিকা হারিয়ে পুরুষরাও সামাজিক আত্মপরিচয় সংকটে ভুগছেন, যা অনেক ক্ষেত্রে মানসিক অবসাদ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বাস্তুসংস্থানের বিনাশ
পরিবেশকর্মী ও গবেষক পিযুষ বাউলিয়া পিন্টু উপকূলীয় সংকটের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘এই অঞ্চলে পরবর্তী সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুরু হয়; বিশেষ করে সিডর থেকে শুরু করে আইলা, তারপরে আম্পান, ইয়াস, বুলবুল এবং মোট ১১-১২টা দুর্যোগ গত পাঁচ-সাত বছরের ভিতরে এই উপকূলে আঘাত হেনেছে। উপকূলে অপরিকল্পিত চিংড়ি ঘের করার কারণে এবং অপরিকল্পিত স্লুইসগেট নির্মাণের ফলে বাঁধগুলো এতটাই দুর্বল হয়ে গেছে যে, সামান্য আঘাতে বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পুরো কৃষি জমি লবণপানিতে প্লাবিত হয়েছে। এর ফলে এই অঞ্চলের মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে বিভিন্ন জায়গায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, গাবুরার দুর্গত এলাকা যেমন-দুর্গাবাটি, হরিণনগর, সিংহড়তলী, গাবুরা ও জেলেখালীর মতো সাত-আটটা জায়গায় নদী ভাঙতে ভাঙতে বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। জীবিকার তাগিদে মানুষ বাধ্য হয়ে এমন পেশায় নামছে যা সে জানে না—যেমন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ভ্যান কেনা। কিন্তু সেই ঋণ শোধ করতে না পেরে ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য অঞ্চলে চলে যেতে হচ্ছে।
হারিয়ে যাচ্ছে লোকসংস্কৃতি ও অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি ও হচ্ছে মানবাধিকার লঙ্ঘন
মানবাধিকারকর্মী স্বদেশের নির্বাহী পরিচালক মাধব চন্দ্র দত্ত বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট যেসব ক্ষতি বা হারানো সম্পদ সহজে অর্থে পরিমাপ করা যায় না, সেগুলোকে আন্তর্জাতিক পরিভাষায় অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি বলা হয়। এর ফলে মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, স্বকীয় পরিচয়, মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন, প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য এবং সামাজিক মেলবন্ধন চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। তবে বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলন কিংবা সরকারি ক্ষতিপূরণ নীতিমালায় কেবল ভেঙে যাওয়া রাস্তাঘাট, বাঁধ বা নষ্ট হওয়া ফসলের মতো দৃশ্যমান আর্থিক ক্ষতির হিসাব করা হয়; কিন্তু মানুষের মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক এই অপূরণীয় ক্ষতিগুলো নীতিমালার কাঠামোর বাইরেই রয়ে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের দায় কম থাকা সত্ত্বেও আমরা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাচ্ছি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতাপনগর ও গাবুরার মতো এলাকাকে বাঁচাতে হলে জিও ব্যাগ নয়, সিসি ব্লকের তৈরি স্থায়ী টেকসই বাঁধ নির্মাণ জরুরি। একই সঙ্গে যারা জমিজমা হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন, তাদের খাস জমিতে পুনর্বাসন এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে মানচিত্র থেকে এই উপকূলীয় ইউনিয়নগুলো একদিন চিরতরে হারিয়ে যাবে।’
পরিবেশ সংগঠক পিযুষ বাউলিয়া পিন্টু ও স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ অঞ্চলের নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতি—পৌষ-পার্বণ, নৌকা বাইচ, কবিগান এবং বনজীবী সংস্কৃতির ‘বনবিবি পূজা’ কিংবা মনসার ভেলা ভাসানোর মতো লোকজ ঐতিহ্যগুলো আজ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। অতীতে বাওয়ালি, মৌয়াল ও জেলেরা সুন্দরবনে যাওয়ার আগে বিপদ-আপদ থেকে বাঁচতে অসাম্প্রদায়িক ‘বনবিবির পূজা’ ও বিশেষ গান গাইতো। কিন্তু মানুষ পেশা ও এলাকা পরিবর্তন করায় নতুন প্রজন্মের কাছে এসব ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে।
দাতিনাখালী এলাকার ভক্ত মুন্ডা বলেন, ‘মানুষ যখন পেটের তাগিদে সংক্ষুব্ধ হয়, তখন আর গান-বাজনা বা সংস্কৃতির চর্চা থাকে না। আম্পান আর ইয়াসের পর মানুষ বেঁচে থাকার চিন্তায় এত বেশি মগ্ন যে উৎসব-পার্বণের আনন্দ উবে গেছে। প্রতিবেশীদের মধ্যকার সেই সামাজিক বন্ধন বা অকৃত্রিম সহমর্মিতাও দিন দিন বিলুপ্ত হচ্ছে।’
স্থায়ী টেকসই বাঁধ ও দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসনের দাবি
গাবুরা ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ ও নদীভাঙনের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকা থেকে মানুষের ক্রমাগত শহরমুখী হওয়ার কারণে গ্রামগুলোতে প্রবীণদের অনুপাত আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। টেকসই নদীবাঁধ, বিকল্প জীবনজীবিকা এবং পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার অভাবে জলবায়ুঝুঁকিতে থাকা এই জনপদগুলো ধীরে ধীরে ‘প্রবীণদের নিঃসঙ্গ দ্বীপে’ পরিণত হচ্ছে।
গাবুরা ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য ফরিদা পারভীন স্থানান্তরের মূল কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘গাবুরা থেকে মানুষের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রধান অনুঘটক হলো জলবায়ু পরিবর্তন—বিশেষ করে ধারাবাহিক নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও তীব্র ঘূর্ণিঝড়। পাশাপাশি এলাকায় আয়ের উৎস অত্যন্ত সীমিত। আগে যেখানে ধান চাষের মৌসুমে ২০ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান হতো, সেখানে নোনা পানির মাছ বা চিংড়ি চাষে মাত্র ১ জন শ্রমিক দিয়েই কাজ চলে যায়। ফলে বাকি ১৯ জন মানুষ পুরোপুরি কর্মহীন হয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশেষ করে হতদরিদ্র পরিবারগুলো জীবিকার সন্ধানে সবচেয়ে বেশি স্থানান্তরিত হচ্ছে। সাধারণত তরুণ ছেলে-বউ ও নাতি-নাতনিরা কাজের খোঁজে শহরমুখী হয়, আর বৃদ্ধ বাবা-মায়েরা গ্রামে একাকী থেকে যান। প্রবীণদের নিজস্ব আয়-রোজগার না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে সন্তানরা তাদের বোঝা মনে করে রেখে যায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গাবুরার প্রতি ১০টি পরিবারের মধ্যে প্রায় ২টি পরিবারই এলাকা ছেড়ে স্থানান্তরিত হয়েছে—যার মধ্যে নদী তীরবর্তী ও দুর্গম মধ্যবর্তী অঞ্চলের মানুষের হার সবচেয়ে বেশি।’
ত্রাণ ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দূর্যোগের পর সরকার ও সংস্থার পক্ষ থেকে যেসব ত্রাণ বরাদ্দ আসে, আমরা তা প্রকৃত দুস্থদের মাঝে বণ্টন করি। কিন্তু প্রতিটি দুর্যোগের পর কেবল কিছু ত্রাণ বা সাময়িক সহায়তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।’
সমাধানে করণীয়
সাতক্ষীরা জলবায়ু পরিষদের আহ্বায়ক আশেক-ই-এলাহী বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কেবল কোনও পরিবেশগত সংকট নয়; এটি স্পষ্টতই মানবাধিকার লঙ্ঘন। জলবায়ুজনিত লবণাক্ততা ও দুর্যোগের কারণে এলাকার কর্মক্ষম মানুষ কাজ না পেয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। ফলে গ্রামগুলোতে চাষাবাদের জন্য তরুণ ও কর্মক্ষম মানুষ পাওয়া যাচ্ছে না; যাদের পাওয়া যাচ্ছে, তারা মূলত প্রবীণ ও বৃদ্ধ।’
তিনি আরও বলেন, ‘৬০-৭০ বছরের এই প্রবীণ মানুষ ও নারীদের ওপর পরিবারের দায়িত্বের চাপ মারাত্মকভাবে বেড়ে যাওয়ায় তারা চরম নিরাপত্তাহীনতা ও অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এই সংকট মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তাব হলো—কৃষিখাতে তরুণদের ধরে রাখতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে সহজ শর্তে ঋণ ও উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, আন্তর্জাতিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যারা দায়ী, তাদের কাছ থেকে যে ক্ষতিপূরণ বা তহবিল আদায় করা হবে; তার প্রধান অংশ এই অঞ্চলের প্রবীণ ও কৃষিবান্ধব সমাজ গঠনে ব্যয় করাই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান কাজ।’
এ বিষয়ে মনের বন্ধু-র সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলর সোনিয়া আক্তার পুষ্প বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলে বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কর্মক্ষম যুবকরা শহরমুখী হওয়ায় বাড়িতে থাকা নারী ও প্রবীণদের ওপর মারাত্মক মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। স্বামী বা পরিবারের প্রধান ব্যক্তি দূরে থাকায় নারীদের একাকীত্ব, অনিশ্চয়তা ও হতাশার পাশাপাশি বৃদ্ধ বাবা-মায়েরাও চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।’
এই মানসিক সংকট কাটিয়ে উঠতে তিনি কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছেন
জীবন ও জীবিকার তাগিদে বারবার যেন দূরে চলে যেতে না হয়, সেজন্য স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। নিয়মিত যোগাযোগ ও মানসিক ভরসা দিতে হবে। পরিবারের যে সদস্যটি দূরে অবস্থান করছেন, তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং মানসিকভাবে সবসময় পাশে থাকার ভরসা দিতে হবে।
দুর্যোগের ধাক্কা সামলে উঠতে কমিউনিটি পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি। এছাড়া মানসিক সমস্যাকে কুসংস্কার বা অবহেলা না করে সঠিক চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
সাতক্ষীরার আশাশুনি ও গাবুরার এই ক্ষয়িষ্ণু বাস্তবতা নিছক কোনও স্থানীয় সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি। আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে প্রকৃত অ-অর্থনৈতিক ক্ষতির ক্ষতিপূরণ আদায় এবং জাতীয় পর্যায়ে স্থায়ী টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে প্রতাপনগরের হাওলাদার বাড়ির মতো শত শত ভিটেমাটি শুধু নোনা জলে তলিয়েই যাবে না, হারিয়ে যাবে একটি জনপদের শতবর্ষী ইতিহাস ও অস্তিত্ব।
(প্রতিবেদনটি ইন্টারনিউজের আর্থ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের ফেলোশিপের অন্তর্ভুক্ত)।