পুলিশ পরিচয়ে বাস থামিয়ে ১৫০ ভরি স্বর্ণ ডাকাতি, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা গ্রেফতার

মাগুরায় পুলিশ পরিচয়ে চলন্ত বাস থামিয়ে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১৫০ ভরি স্বর্ণ ও নগদ টাকা লুটের ঘটনায় মাগুরা পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মারুফ হোসেনসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডাকাতি হওয়া স্বর্ণের পাঁচটি বার উদ্ধার করা হয়েছে। গত ৬ অক্টোবর দুপুরে মাগুরা সদর উপজেলার রামনগর বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। মামলার এজাহারে লুট হওয়া স্বর্ণের মূল্য প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা উল্লেখ করেছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন মাগুরার এসপি মোল্লা আজাদ হোসেন।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, ভুক্তভোগী মজিবর রহমান মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার বাসিন্দা এবং পেশায় স্বর্ণ ব্যবসায়ী। গত ৬ অক্টোবর ঢাকার তাঁতীবাজারের পীযূষ নামের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১৫০ ভরি স্বর্ণ সংগ্রহ করেন তিনি। পরে স্বর্ণগুলো ঝিনাইদহের ব্যবসায়ী অনিমেষ মজুমদারের কাছে পৌঁছে দিতে গোল্ডেন লাইন পরিবহনের একটি বাসে সায়েদাবাদ থেকে রওনা হন।

বাসটি দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে মাগুরা সদর উপজেলার রামনগর বাজার এলাকায় পৌঁছালে ১২ থেকে ১৫ জনের একটি দল নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিয়ে বাসটির গতিরোধ করে। এরপর মজিবর রহমানকে জোর করে বাস থেকে নামিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায় তারা।

এজাহারে বলা হয়, দুর্বৃত্তরা তার কাছে থাকা স্বর্ণ বের করে দিতে চাপ দেয়। এতে রাজি না হওয়ায় তাকে লোহার রড দিয়ে আঘাতের চেষ্টা করা হয়। তিনি মাথা সরিয়ে নিলে আঘাতটি ডান কাঁধে লাগে। এতে তার কাঁধের হাড় ভেঙে যায়। পরে মারধর করে প্যান্টের বেল্টের নিচে বিশেষভাবে তৈরি পকেটে রাখা ১৫০ ভরি তেজাবি স্বর্ণের দণ্ড ও নগদ ৬০ হাজার টাকা নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

মজিবর রহমানের চিৎকার শুনে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে লুট করা মালামাল নিয়ে পালিয়ে যায় ডাকাত দলের সদস্যরা।

পরে আহত অবস্থায় মজিবর রহমান মাগুরা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। নিরাপত্তাহীনতার কারণে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েই তিনি মাগুরা ছেড়ে চলে যান। ১৫ অক্টোবর তিনি মাগুরা সদর থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। পরে ২৮ অক্টোবর রাতে পেনাল কোডের ১৭০, ৩৯৫ ও ৩৯৭ ধারায় ডাকাতির মামলা করা হয়। এতে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।

মামলার তদন্তে প্রথমে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করা হয় ঝিনাইদহের স্বর্ণ ব্যবসায়ী অনিমেষ মজুমদারকে (৫৫)। তিনি ঝিনাইদহের গীতাঞ্জলি সড়কের গিনি হাউস নামের একটি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের মালিক।

এরপর একই মামলায় গ্রেফতার করা হয় মাগুরা পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মারুফ হোসেনকে। পুলিশের ভাষ্য, তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডাকাতি হওয়া স্বর্ণের পাঁচটি বার উদ্ধার করা হয়েছে।

এ ছাড়া মামলায় গ্রেফতার অন্য দুজন হলেন মাগুরার পারনান্দুয়ালী ব্যাপারীপাড়ার বাসিন্দা মো. জুয়েল হোসেন ও তৌকির আহমেদ। গ্রেফতার করা হয়েছে মারুফ হোসেনের শ্বশুর ফরিদ মণ্ডলকেও। এ নিয়ে এ মামলায় মোট পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

গ্রেফতারদের মধ্যে জুয়েল হোসেন ও তৌকির আহমেদ কারাগারে রয়েছেন। মারুফ হোসেনকে শুক্রবার বিকালে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে আদালত তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মামলাটির তদন্ত করছেন জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক মোহাম্মাদ আশরাফুজ্জামান।

এদিকে স্বর্ণ ডাকাতির ঘটনার কয়েক দিন পরই মাগুরায় খুন হন পৌর যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক শাকের হোসেন (৩৯)। গত ২১ অক্টোবর ভোরে মাগুরা পৌরসভার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে রয়েল পরিবহনের কাউন্টারে গুলিতে তিনি নিহত হন। এ ঘটনায় তার স্ত্রী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা ও অস্ত্র আইনে মামলা করেন।

মামলার পরদিন রাতে রনি শিকদার (৩৮) ও শামীমা তাবাসসুম (৩১) নামের দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। রনি শিকদার ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। পরে আদালত তাদের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

স্বর্ণ ডাকাতি ও যুবদল নেতা হত্যার ঘটনার মধ্যে কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে দুটি ঘটনার মধ্যে কোনও সম্পর্ক আছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।

মাগুরার এসপি মোল্লা আজাদ হোসেন বলেন, চাঞ্চল্যকর স্বর্ণ ডাকাতি ও যুবদল নেতা হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটনে পুলিশ কাজ করছে। গ্রেফতার আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে স্বর্ণের পাঁচটি টুকরা জব্দ করা হয়েছে। দুটি ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে। শিগগিরই ঘটনার রহস্য উন্মোচিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।