বাড়িতে বাবার মরদেহ রেখে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন বেনাপোলের আফিয়া খাতুন মাসুমা। বাবাকে হারানোর শোক বুকে নিয়েই সব পরীক্ষা শেষ করেন তিনি। শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলে এ গ্রেড পেয়েছেন আফিয়া। তার এ সাফল্যে পরিবার, শিক্ষক ও সহপাঠীদের মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
আফিয়া যশোরের শার্শা উপজেলা কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। তিনি বেনাপোল পোর্ট থানার নামাজগ্রাম এলাকার প্রয়াত আব্দুস সামাদের ছোট মেয়ে। তার বাবা বেনাপোলের মেসার্স তাজমহল ট্রান্সপোর্ট ও হাজী মুছা করিম অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী ছিলেন। তিনি একজন আমদানিকারকও ছিলেন।
পরিবার ও কলেজ সূত্রে জানা যায়, গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যায় বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়েন আব্দুস সামাদ। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। রাতে মরদেহ বাড়িতে আনা হয়। পরদিন সকালে স্বজনেরা যখন দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন বাবার মরদেহ বাড়িতে রেখেই এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে যান আফিয়া। বেনাপোল কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দেন তিনি। পরীক্ষা শেষে বাড়িতে ফিরে বাবার দাফনে অংশ নেন।
বাবার মৃত্যুর পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও স্বজনদের পরামর্শে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন আফিয়া। তাকে শেষবারের মতো বাবাকে দেখার সুযোগ দিতে দাফনের সময়ও পিছিয়ে দেওয়া হয়। তবে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে তিনি স্বজনদের বলে যান, তাকে ছাড়াই যেন বাবার দাফন সম্পন্ন করা হয়। বাবাকে হারানোর শোক নিয়েই পরবর্তী পরীক্ষাগুলো শেষ করেন তিনি।
ফল প্রকাশের পর আফিয়া বলেন, বাবা সব সময় চাইতেন, আমার ফল যেন ভালো হয়। পরীক্ষার সময় বাবাকে হারানো ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত। বাবার স্বপ্ন পূরণের কথা ভেবেই নিজেকে সামলে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম।
তিনি আরও বলেন, আমি আরও ভালো ফল করতে পারতাম। পরীক্ষার হলে লিখতে গিয়ে বারবার মৃত বাবার মুখ ভেসে উঠছিল। বাবা বেঁচে থাকলে এ ফল দেখে খুব খুশি হতেন। সবার কাছে বাবার জন্য দোয়া চাই।
শার্শা উপজেলা কলেজের অধ্যক্ষ হাসান-উজ-জামান বলেন, আফিয়া শুরু থেকেই মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী। সে ভালো ফল করবে বলে শিক্ষকদের প্রত্যাশা ছিল। পরীক্ষা চলাকালে বাবার মরদেহ বাড়িতে রেখে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সে কলেজের সম্মান বাড়িয়েছে।
তিনি বলেন, ব্যক্তিগত জীবনের এত বড় শোক সামলে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এবং এ গ্রেড অর্জন করা তার অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তার পরিচয়। তার ফলে কলেজের সবাই খুশি। বাবার মৃত্যু না হলে সে জিপিএ-৫ পেত বলে শিক্ষকদের প্রত্যাশা ছিল। ভবিষ্যতেও আফিয়া সাফল্য ধরে রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
শার্শা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, বাবাকে হারানো যে কারও জন্যই কষ্টের। সেই শোক নিয়েও এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে আফিয়ার ভালো ফল করা আনন্দের সংবাদ। উপজেলা প্রশাসন এ মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশে থাকবে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে তার পরিবার সহযোগিতা চাইলে সর্বোচ্চ সহায়তা করা হবে।