জামালপুরে গণহত্যার স্মৃতিচিহ্নগুলো আজও অরক্ষিত!

সড়িষাবাড়ির পিংনা বারইপটল এলাকার বধ্যভূমিমহান মুক্তিযুদ্ধের সময় জামালপুরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার শহীদদের অনেক গণকবর স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। ফলে নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে জেলার প্রায় অর্ধশত গণকবর ও বধ্যভূমি।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এ জেলার বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষকে ধরে নিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে, নির্বিচারে গুলি করে ও নানা উপায়ে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করেছে। হত্যার পর গণকবর দিয়েছে। নৃশংস ওইসব হত্যাকাণ্ডের স্মৃতিচিহ্নগুলো কালের বিবর্তনে মুছে যাচ্ছে। সংরক্ষণের অভাবে অসংখ্য গণকবর শনাক্ত করার পরও মর্যাদাহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

জেলার মুক্তিযোদ্ধাদের দেওয়া তথ্য মতে, জামালপুরে সব মিলিয়ে প্রায় অর্ধশত বধ্যভূমি ও গণকবর রয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় মুক্তিযোদ্ধা ও পাকিস্তানি সেনাদের প্রধান ঘাঁটি ছিল বকশীগঞ্জের ধানুয়া কামালপুর। ধানুয়া কামালপুরে বিজিবি ক্যাম্পের সামনে স্মৃতিস্তম্ভের উত্তর পাশেই রয়েছে বিশাল একটি বধ্যভূমি। এছাড়াও এই এলাকার কছিম উদ্দিন চেয়ারম্যানের বাড়ির পশ্চিম পাশে রাস্তার দু’পাশে বেশ কয়েকটি গণকবর অরক্ষিত অবস্থায় এখনও পড়ে রয়েছে। বকশীগঞ্জ খাদ্য গুদাম ও ডাক বাংলোর কাছাকাছি দুইটি বধ্যভূমি বর্তমানে বেদখল হয়ে গেছে।

ধানুয়া কামালপুর বাজারের পশ্চিমে ইউনিয়ন পরিষদের পেছনে একটি বড় বধ্যভূমি বর্তমানে পুকুরে পরিণত হয়েছে। তাছাড়াও বকশীগঞ্জ এনএম উচ্চ বিদ্যালয়ের উত্তর পাশে ‘৭১-এর মৃত্যুকুপ নামে পরিচিতি বধ্যভূমিটিও সংরক্ষণের অভাবে এখন নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে বসেছে। বকশীগঞ্জের পুরাতন গো-হাট এলাকায় একটি গণকবর সংরক্ষণের অভাবে আবাদি জমি ও পুকুরে পরিণত হয়েছে। উলফাতুনন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের হলরুম ছিল পাকিস্তানি সেনাদের নির্যাতন কক্ষ বা টর্চারসেল। বকসীগঞ্জের মাতৃমঙ্গল কেন্দ্র,কামালপুর উপ-স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের পাশে প্রায় বেশ কিছু গণকবর এখনও অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

জামালপুর পৌর শহরের ব্রহ্মপুত্র নদের তীর সংলগ্ন শ্মশানঘাট এলাকায় ১৯৭১ সালে  মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাগামী লোকজনদের ধরে নিয়ে নির্যাতনের পর গুলি করে হত্যা করা হতো। জামালপুর পৌরসভার বনপাড়া এলাকার ফৌতি গোরস্থানে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী মানুষের লাশ মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে। সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের ডিগ্রি হোস্টেল, পিটিআই, ওয়াপদা রেস্ট হাউজ, পানি উন্নয়ন বোর্ড এলাকায়  ছিল পাক-হানাদার বাহিনীর শক্ত ঘাঁটি ও টর্চার সেল। এখানেও শত শত বাঙালিকে নির্যাতনের পর নির্মমভাবে হত্যা করে তাদের মৃতদেহ মাটি চাপা দেওয়া হয়েছিল। এ জায়গাগুলো চিহ্নিত করা হলেও আজো সংরক্ষণ করা হয়নি।

দেওয়ানগঞ্জ রেলস্টেশনের লোকোশেড,স্টেশন সংলগ্ন জিআরপি থানা,আলেয়া মাদ্রাসা,জিল বাংলা চিনিকল, দেওয়ানগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ, কাঠারবিলের গয়ারডোবা, ফারাজী পাড়া, পুরাতন বাহাদুরাবাদঘাট এলাকা মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ঘাঁটি ও নির্যাতন ক্যাম্প ছিল। সরিষাবাড়ি উপজেলার পিংনার বারইপটল, পালপাড়া ও জগন্নাথগঞ্জ ঘাটে রয়েছে ছোটবড় অসংখ্য গণকবর।

এছাড়াও ইসলামপুর উপজেলার কুলকান্দি,খান পাড়া,পৌর গোরস্থান এলাকাতেও ছোটবড় অনেক গণকবর রয়েছে।

মেলান্দহ উপজেলায়ও অসংখ্য গণকবর ও টর্চারসেল রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ অভাবে কালের বির্বতনে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এসব গণকবর। আগামী ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারবে না এসব গণকবর ও বধ্যভূমির সঠিক ইতিহাস। তাই সমগ্র জেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব গণকবর অর্থাৎ বধ্যভূমির স্মৃতি রক্ষার্থে এগুলো সংরক্ষণের জোর দাবি জানিয়েছেন জেলাবাসী।

এ ব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ জামালপুরের কমান্ডার শফিকুল ইসলাম খোকা বলেছেন, ‘জেলার বধ্যভূমি ও গণকবরগুলো সংরক্ষণ ও সংস্কারের ব্যাপারে ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। কিন্ত এখন পর্যন্ত কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।’

জামালপুরের জেলা  প্রশাসক মো. শাহাবুদ্দিন খান জানিয়েছেন, ‘জেলার বধ্যভূমি ও গণকবরগুলো ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। খুব তাড়াতাড়িই এগুলো সংস্কার ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।’

/এফএস/

আরও পড়ুন- 



বাংলাদেশ সীমান্তের অর্ধেক কাঁটাতারে ঘিরে ফেলেছে ভারত