এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে ডুবে গেছে ময়মনসিংহ মহানগরীর অলিগলি, হাটবাজার ও রাস্তাঘাট। সেইসঙ্গে বাসাবাড়ি ও দোকানের ভেতরে পানি ঢুকে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। অথচ দেড় বছর আগে সাড়ে ১১ কোটি টাকার ড্রেনেজ উন্নয়নের কাজ শেষ করেছিল ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন। বিপুল অঙ্কের এই উন্নয়ন কাজে আসেনি। জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানও হয়নি। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগরবাসী।
নগরবাসী বলছেন, পুরো নগরীর বৃষ্টির পানি চারটি খালের মাধ্যমে সুতিয়া নদীতে যাওয়ার কথা। এই খালগুলো খনন না করায় শহরের পানি সহজে বের হতে পারে না। এজন্য কোনও উন্নয়ন কাজে আসছে না। জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানও হয় না।
বৃহস্পতিবার (১৫ জুন) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত একটানা বৃষ্টি হয়। বৃষ্টির পানিতে নগরীর বেশিরভাগ এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। কোনও কোনও এলাকায় জমেছে হাঁটুপানি।
রাত ৯টার দিকে সরেজমিনে নগরীর সিকে ঘোষ রোডের ছায়াবাণী সিনেমা হলের সামনে, ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজের সামনে, চরপাড়া মোড়ের আগে, পূরবী সিনেমা হলের সামনে এবং চরপাড়া কপিক্ষেত, নয়াপাড়া, মাসকান্দা, বলাশপুর, কৃষ্টপুর ও চামড়া গুদামসহ বেশিরভাগ এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। এসব এলাকার কিছু স্থানে হাঁটুপানি আবার কিছু স্থানে আরও বেশি পানি দেখা গেছে। পানিতে যানবাহন চালাতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন চালকরা। তবে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। অনেক দোকানপাট, নগরীর অলিগলির বাসাবাড়িতে পানি ঢুকেছে।
ভোগান্তির কথা উল্লেখ করে নগরীর অটোরিকশাচালক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘সড়কে জলাবদ্ধতার কারণে অটোরিকশা চালানোর সময় পানি ঢুকে ব্যাটারি নষ্ট হয়ে গেছে। এতে বিপাকে পড়েছি।’
একটু বৃষ্টি হলেই নগরী ডুবে যায়, অটোরিকশা নিয়ে বের হওয়া যায় না অভিযোগ করে সিএনজি অটোরিকশাচালক কামাল হোসেন বলেন, ‘নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় অল্প বৃষ্টিতেই সড়ক ডুবে যায়। ঠিকমতো গাড়ি চালানো যায় না। গাড়িতে পানি ঢুকে অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়।’
বৃষ্টিতে অলিগলি ডুবেছে এবং বাসায় পানি ঢুকেছে জানিয়ে নগরীর বলাশপুর এলাকার বাসিন্দা কামরুল হাসান বলেন, ‘এই পানি নামতে ৮-১০ ঘণ্টা সময় লাগবে। বিশেষ করে ঘরে নোংরা পানি ঢুকে মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে। ঘর থেকে বের হতে পারছি না। রাতের রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে আছে।’
চরপাড়া কপিক্ষেত এলাকার বাসিন্দা সাবিনা আক্তার বলেন, ‘সামান্য বৃষ্টি হলেই সড়কে পানি জমে। বাড়িঘরে পানি ঢোকে। বৃহস্পতিবারের বৃষ্টিতে এলাকার অধিকাংশ বাড়িঘরে পানি ঢুকেছে। এখনও পানি নামেনি। নোংরা পানি ঘরে ঢোকায় ছেলেমেয়েকে নিয়ে খাটের ওপর বসে আছি। প্রতি বছরই এমন ঘটনা ঘটলেও এই সমস্যা নিরসনে কোনও উদ্যোগ নেয় না সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীররা।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সাল থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি মেগা প্রকল্পের আওতায় আন্ডারগ্রাউন্ড পাইপ লাইনসহ ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করা হয়েছে। এই প্রকল্পে প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে নগরীতে বড় বড় পাইপ বসানোর মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়। ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে কাজ শেষ হয়। কিন্তু খালগুলো খনন না করায় ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন কাজে আসেনি।
বারবার দাবি তুললেও জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনও উদ্যোগ নেয়নি সিটি করপোরেশন এমনটি জানালেন ময়মনসিংহ নাগরিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার নুরুল আমিন কালাম। তিনি বলেন, ‘নগরীর প্রধান সমস্যা জলবদ্ধতা। সবচেয়ে কষ্টের এবং দুর্ভোগের। এই দুর্ভোগ থেকে নগরবাসী কোনোভাবেই পরিত্রাণ পাচ্ছেন না। বর্ষা আসার আগেই অল্প বৃষ্টিতে নগরীর অধিকাংশ এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে এই নিয়ে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ উদাসীন।’
সিটি করপোরেশনের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘বড় প্রকল্প হাতে নিয়ে খাল দখলমুক্ত করে পরিকল্পিতভাবে খনন করা গেলে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন হবে।’
জলাবদ্ধতার কারণে নগরবাসীর দুর্ভোগের কথা স্বীকার করে সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশন নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে নগরবাসী সুফল পাবেন।’
এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের মেয়র ইকরামুল হক টিটু বলেন, ‘সিটি করপোরেশন এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থাসহ সড়কের উন্নয়নে এক হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। বরাদ্দের অর্থ একনেক সভায় অনুমোদন হয়েছে। প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’