জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন। মাঝেমধ্যে খসে পড়ছে ছাদের ঢালাই ও পলেস্তারা। তার ভেতরে বছরের পর বছর ধরে চলছে নাগরিক সেবা। এটি বরিশাল সিটি করপোরেশনের নগর ভবনের বর্তমান অবস্থা। যেন ওপরে ফিটফাট ভেতরে সদরঘাট। এ অবস্থায় সেবাগ্রহীতা ও কর্মীদের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
৩৫ বছরের পুরোনো তিনতলা ভবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নাগরিক সেবা দিয়ে আসছেন মেয়র, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রায় দেড় হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। ঝুঁকির মধ্যে প্রতিদিন সেবা নিচ্ছেন হাজারো নগরবাসী।
সর্বশেষ গত ৪ মে ভবনের তিনতলায় প্রকৌশল ও ভান্ডার শাখায় ছাদের ঢালাই-পলেস্তারা খসে পড়ে। অল্পের জন্য রক্ষা পান সেখানকার কর্মরতরা। এমন ঘটনা একবার-দুবার ঘটেনি। বহুবার বিভিন্ন কক্ষের ছাদের এবং পিলারের ঢালাই ও পলেস্তারা খসে পড়ে। এমন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে সিলিং ফ্যান চালাতেও ভয় পান সেখানকার কর্মরতরা।
সিটি করপোরেশনের দুজন কর্মকর্তা জানান, বরিশাল নগর ভবন হচ্ছে ওপরে ফিটফাট ভেতরে সদরঘাট। মানে বাইরে চাকচিক্য দেখলে কারও মনে হবে না এতটা জরাজীর্ণ অবস্থায় চলছে এই ভবনের। মেয়র, প্রশাসক, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা যারাই দায়িত্ব পালন করছেন তারাই তাদের কর্মকাণ্ড শেষ করে চলে যাচ্ছেন। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নিয়ে কারও কোনও মাথাব্যথা নেই। যদি কোনও দুর্ঘটনা ঘটে সেক্ষেত্রে মরতে হবে সেখানে কর্মরতদের। এরপর যদি কারও টনক না নড়ে, তাহলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনার শঙ্কা আছে।
সিটি করপোরেশনে সেবা নিতে আসা সোহাগ উল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেখানে সেবা নিতে আসবো সেখানে প্রবেশ করতেই ভয় লাগে। প্রতিটা কক্ষের অবস্থা খুবই খারাপ। তারপরও জরুরি কাজ থাকায় দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজটি সেরে ভবন থেকে বের হয়ে গেছি।’
একই কথা বললেন একাধিক নগরবাসী। তাদের দাবি দ্রুত সময়ের মধ্যে ভবনটি অপসারণ করে নতুন ভবন নির্মাণ করার। তা না হলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
এ বিষয়ে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্বপন কুমার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বর্তমানে করপোরেশনে নিয়মিত কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন ৪২৫ জন। চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পালন করছেন সাত জন। দৈনিক মজুরি ভিত্তিক শ্রমিক রয়েছে ১ হাজার ৩৭৮ জন। এর মধ্যে থেকে দেড় হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী-শ্রমিক ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের নিচেই কাজ করছেন। আর প্রতিদিন সে ভবনে সেবা নিতে আসছেন হাজারো নগরবাসী। এরা যতক্ষণ ভবনের নিচে থাকছেন সবাইকে কিন্তু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। দুর্ঘটনা এড়াতে জরাজীর্ণ ভবন থেকে মেয়র ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কক্ষ এবং সচিব, ম্যাজিস্ট্রেট, প্রকৌশল, প্রশাসনিক, হিসাববিভাগ বরিশাল অডিটরিয়ামে স্থানান্তর করা হচ্ছে। কীভাবে অপর শাখাগুলো বরিশাল সিটি করপোরেশনের দুটি মার্কেটে স্থানান্তর করে ভবনটি অপসারণ করা যায় সে চিন্তা আছে নতুন প্রশাসকের।’
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ সূত্র এবং ভবনের উদ্বোধনী নাম ফলক থেকে জানা গেছে, ১৯৯০ সালের ৪ মে তৎকালীন স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এম নাজিউর রহমান মঞ্জু বরিশাল পৌরসভার নবনির্মিত ভবনের উদ্বোধন করেন। ওই সময় ভবনটি দোতলা ভীত দিয়ে নির্মিত হয়। বরিশাল সিটি করপোরেশনের দ্বিতীয় পরিষদের মেয়র মৃত শওকত হোসেন হিরন ওই ভীতের ওপর তিনতলা নির্মাণ করেন। একইসঙ্গে ভবনটির বাহিরের চাকচিক্য আনতে গ্লাস দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এ ছাড়া ভবনের ভেতর ও মেয়র এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কক্ষ থেকে শুরু করে কিছু কিছু কক্ষ আধুনিক করে গড়ে তোলা হয়। আধুনিক করা হয় প্রথমতলা থেকে তৃতীয়তলা ওঠার সিঁড়িও। কিন্তু দোতলা ভবনের তৃতীয়তলা তোলা সঠিক ছিল না। যার ফলে ভবনের পিলার থেকে শুরু করে সবকিছুতেই ফাটল দেখা দেয়। এই ফাটলের মধ্যেই তৃতীয়, চতুর্থ এবং বর্তমানে পঞ্চম পরিষদের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে।
সিটি করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, জরাজীর্ণ ভবন থেকে পরিত্রাণে পঞ্চম পরিষদে দায়িত্বে থাকা তৎকালীন মেয়র খোকন সেনিয়াবাত নতুন বহুতল ভবনের নকশা প্রণয়ন করেন। এরপর আর ভবন নির্মাণের কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এ ব্যাপারে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, বর্তমানে তার প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সেবা গ্রহণকারী নগরবাসীর নিরাপত্তা দেওয়া। এই লক্ষ্য নিয়ে তিনি কাজ করছেন। আপাতত নগরীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সংলগ্ন বহুতল বরিশাল অডিটোরিয়াম, হাসপাতাল রোড এলাকার সিটি করপোরেশনের নির্মিত চারতলা মার্কেট এবং সদর রোডে সিটি করপোরেশনের বহুতল মার্কেটে শাখাগুলো স্থানান্তর করা হবে। এর মধ্যে নতুন পরিকল্পনা করে জরাজীর্ণ ভবনটি অপসারণ করে সেখানে দৃষ্টিনন্দন বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সেই বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। যত দ্রুত সম্ভব ভবনটি অপসারণ এবং নতুন ভবনের কাজ শুরু করা হবে।
২০০২ সালে বরিশাল সিটি করপোরেশন ঘোষণা করা হয়। ৫৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকার ৩০টি ওয়ার্ড নিয়ে সিটি করপোরেশন গঠিত হয়। বর্তমানে প্রায় পাঁচ লাখ লোকের বসবাস নগরীতে।









