ময়মনসিংহ নগরীর রামকৃষ্ণ মিশন রোডের ভাড়া বাসায় হত্যাকাণ্ডের শিকার রাজিব আহমেদ রুবেলের (৩৫) লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। সোমবার (০৬ জুলাই) বিকালে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে লাশ স্বজনদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ময়নাতদন্তের কাজে নিয়োজিত ডা. রোমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ময়নাতদন্তে নিহতের গোপনাঙ্গে বীর্যপাতের কোনও আলামত শনাক্ত হয়নি। অধিকতর তদন্তের জন্য এবং ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ব্লাডসহ নমুনা সংরক্ষণ করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ ঢাকার সিআইডি ল্যাবে পরীক্ষা করলেই মারা যাওয়ার আগে কোনও নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলেন কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।’
রবিবার (৫ জুলাই) সকালে নগরীর রামকৃষ্ণ মিশন রোড সংলগ্ন ৩৬ বাড়ি কলোনি এলাকায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত রাজিব আহমেদ রুবেল নগরীর আর কে মিশন রোড এলাকার আব্দুল হামিদের ছেলে। ওই কলোনি এলাকায় ধর্ষণের অভিযোগ তোলা নারীর ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল পেয়ে দুপুরে তার গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। স্থানীয়ভাবে তিনি ‘কাইল্যা রুবেল’ নামে পরিচিত ছিলেন। ওই দিন বিকালে এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ওই নারীর চার ছেলেকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। রবিবার রাত ১২টার দিকে কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা করেন নিহতের বাবা আব্দুল হামিদ। এতে যে নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ তোলা হয়েছিল তাকেসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও তিন থেকে চার জনকে আসামি করে মামলা করা হয়।
মামলার এজাহারে নিহতের বাবা উল্লেখ করেন, প্রায় ১৫ দিন আগে রাজিব আর কে মিশন রোডের ওই বাসা ভাড়া নিয়ে একা বসবাস শুরু করেন। বাসা নেওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই বাড়ির মালিকের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার বিরোধ শুরু হয়। একপর্যায়ে বাড়ির মালিক তাকে দ্রুত বাসা ছেড়ে দিতে বলেন। তিনি সময় চাইলেও বাড়ির মালিক ও তার ছেলেরা নিয়মিত ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছিলেন। রবিবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে বাসা ছাড়াকে কেন্দ্র করে আবারও বাগবিতণ্ডা হয়। পরে বাড়ির মালিক ও তার ছেলেদের সঙ্গে অন্য আসামিরা রুবেলের কক্ষে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করেন।
খবর পেয়ে নিহতের বাবা ঘটনাস্থলে গিয়ে ছেলের লাশ শয়নকক্ষের বিছানায় পড়ে থাকতে দেখেন। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করা হলে পুলিশ, সিআইডি ও পিবিআইয়ের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠান।
এদিকে রুবেলকে হত্যার রহস্য উদঘাটনের কথা জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মাদকের আড্ডা ও বাসা ছাড়তে বলায় বাসার মালিক ওই নারীকে মারধর এবং শ্লীলতাহানির ক্ষোভে চার ভাই মিলে রুবেলকে হত্যা করেছেন।
সোমবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে ময়মনসিংহ পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান এসব তথ্য জানিয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনে মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রায় এক মাস আগে রুবেল ওই বাসার একটি কক্ষ ভাড়া নেন। তার চলাফেরা ও কর্মকাণ্ড নিয়ে বাড়ির মালিকের আপত্তি ছিল। অভিযোগ আছে, তিনি সেখানে বিভিন্ন ব্যক্তিকে নিয়ে আড্ডা দিতেন এবং মাদক সেবন করতেন। এসব কারণে বাড়ির মালিক তাকে পরবর্তী মাস থেকে বাসা ছেড়ে দিতে বলেন। তবে জোর করে সেখানে থাকতে চাইছিলেন রুবেল।’
মিজানুর রহমান জানান, গতকাল রবিবার সকাল ৬টা থেকে ১০টার মধ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটে। সকালে মদপান করে রুবেল প্রথমে বাড়ির মালিক ওই নারী ও তার ছেলেদের কক্ষের দরজায় লাথি মেরে তাদের ঘুম থেকে তোলেন। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে তিনি বাড়ির মালিককে মারধর ও শ্লীলতাহানি করেন। পরে বাড়ির মালিকের চার ছেলে পরিকল্পনা করে একটি চায়নিজ কুড়াল দিয়ে রুবেলের গলায় আঘাত করে হত্যা করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। ঘটনার পর ছায়া তদন্ত শুরু করে পিবিআই। তদন্তের একপর্যায়ে ওই নারীর চার ছেলেকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে তিন জন মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। চার ভাই প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, মায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও শ্লীলতাহানির ঘটনার জেরে তারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। তবে বিষয়টি আরও গভীরভাবে তদন্ত করা হচ্ছে এবং অন্য কেউ জড়িত আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।