রিপন মিয়ার বিরুদ্ধে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ, সালিশে ৫ লাখ জরিমানা, গ্রামছাড়ার নির্দেশ

নেত্রকোনা সদর উপজেলায় এক স্কুলছাত্রীকে (১৪) ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর রিপন মিয়ার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় থানায় না গিয়ে সোমবার রাতে বিএনপির স্থানীয় কার্যালয়ে সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়েছে। তাকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করার পাশাপাশি এলাকাছাড়া করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। 

রিপন মিয়া দক্ষিণ বিশিউড়া গ্রামের মোক্তাল হোসেনের ছেলে। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় তিনি। বেশ কয়েক বছর ধরে সামাজিকমাধ্যমে রিপন জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে পরিচিতি পান। তিনি পেশায় কাঠমিস্ত্রি।

সোমবার রাতের সালিশের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনা শুরু হয়। তবে পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কাঠমিস্ত্রি রিপন মিয়া ২০১৬ সাল থেকে ফেসবুকে ভিডিও তৈরি করছেন। ‘হাই আই এম রিপন ভিডিও’ ও ‘আই লাভ ইউ, এটাই বাস্তব’—এসব সংলাপের ভিডিও দিয়ে পরিচিতি পান রিপন। ২০১৯ সালে ‘রিপন মিয়া’ নামে ফেসবুকে একটি পেজ খোলেন। পেজটিতে বর্তমানে ফলোয়ারের সংখ্যা ১৯ লাখ।

ভুক্তভোগী কিশোরীর পরিবারের অভিযোগ, গত শনিবার রাত ৮টার দিকে তাদের বাড়িতে যান রিপন। তখন ওই স্কুলছাত্রী বাড়ির উঠানে রান্না করছিল। তার বাবা স্থানীয় বাজারে চায়ের দোকানে ও মা বাইরে কাজে ছিলেন। এ সুযোগে ওই ছাত্রীকে জোর করে বাড়ির পাশের একটি জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণ করেন রিপন। পরে মেয়েটির চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে রিপন পালিয়ে যান।

পরিবারটির দাবি, ভিডিও বানানোর কথা বলে রিপন আগে থেকেই কিশোরীটিকে উত্ত্যক্ত করতেন। লোকলজ্জার ভয়ে পরিবারটি প্রথমে বিষয়টি প্রকাশ করেনি। পরে ঘটনাটি এলাকায় জানাজানি হলে সোমবার রাতে স্থানীয় বাজারে বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে সালিশ বৈঠক ডাকা হয়।

সালিশে উপস্থিত একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে ওই সালিশ বৈঠক হয়। সেখানে বিএনপি নেতা আবদুল হাই মুন্সি, আতাউর রহমান, স্থানীয় জামায়াত নেতা জয়নাল আবেদীন, দৌলত মিয়াসহ এলাকাবাসী ছিলেন। সেখানে রিপন মিয়া নিজের দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চান। পরে তাকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানার টাকা পাঁচ দিনের মধ্যে দেওয়ার জন্য সময় বেঁধে দেন সালিশদাররা। সেইসঙ্গে এলাকাছাড়া করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়।

সালিশের কয়েকটি ভিডিও মঙ্গলবার সকালে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ৩০ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, অভিযোগ স্বীকার করে উপস্থিত সবার কাছে ক্ষমা চাইছেন রিপন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘ভুল করলেও করছি, না করলেও করছি। আমি, আফনেরার লগে থাহন লাগবো। ভুল তো মানুষ করেই, আমি একটা ভুল কইরাইলছি।’ কথার একপর্যায়ে তিনি মাফ চাওয়ার জন্য ফজলুর রহমানের পায়ে ধরেন।

এ বিষয়ে ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমান বলেন, ‘মেয়েটি দরিদ্র পরিবারের। বিষয়টি জানার পর মেয়েটির পরিবার ও গ্রামের লোকজন আমাদের কাছে বিচার নিয়ে আসে। পরিবারের মামলা চালানোর সামর্থ্যও নেই। পরে আমরা এলাকাবাসী মিলে সালিশে বসেছিলাম। তারপর বলেছি আইনি পদক্ষেপ নিতে। সালিশে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এখন পুলিশ এসেছে, আমাদের সঙ্গে কথা বলছে।’

এরই মধ্যে ভিডিওগুলো নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই ধর্ষণের মতো ফৌজদারি অপরাধের বিচার গ্রাম্য সালিশে করাকে আইনবহির্ভূত বলে মন্তব্য করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুজন সালিশদার জানান, ধর্ষণের ঘটনা গ্রাম্য সালিশে নিষ্পত্তি করা ঠিক হয়নি। এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার। যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার কেউ সাহস করতে না পারে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক (উত্তরাঞ্চল) প্রীতম সোহাগ ফেসবুকে লিখেছেন, ‌‘ধর্ষণের মতো অভিযোগের বিচার আইন অনুযায়ী পুলিশ ও আদালতের মাধ্যমে হওয়া উচিত। দলীয় কার্যালয়ে বসে এমন ফৌজদারি অপরাধের বিচার করার চেষ্টা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার শামিল এবং এটি নিন্দনীয়।’

ভুক্তভোগীর বাবা বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, স্বামী-স্ত্রী মিলে একটি চায়ের দোকান চালাই। যে কারণে আমার কিশোরী মেয়ে বাড়িতে একা থাকে। এই সুযোগে রিপন মিয়া ঘরে ঢুকে মেয়েকে ধর্ষণ করেছে। পরে এলাকার সালিশদাররা বিচার করেছে। তবে আমি প্রশাসনের সহযোগিতার মাধ্যমে রিপনের সুষ্ঠু বিচার চাই।’ 

এ বিষয়ে জানতে রিপন মিয়ার মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করে বন্ধ পাওয়া যায়। সালিশ বৈঠকের পর তিনি গাঢাকা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা।

এ ব্যাপারে নেত্রকোনা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের বলেন, ‘ধর্ষণের ঘটনায় বসা সালিশের ভিডিও সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের মতো ঘটনা সালিশ বা দরবারের মাধ্যমে মীমাংসা করার সুযোগ নেই। যারা বিষয়টি সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা করতে চেয়েছিল তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এ ঘটনায় এখনও থানায় কোনও লিখিত অভিযোগ করেনি ভুক্তভোগীর পরিবার। অভিযোগ দেওয়ার জন্য মেয়েটির পরিবারকে থানায় আসতে বলা হয়েছে। সালিশে থাকা দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অভিযুক্ত রিপনকেও আটকের চেষ্টা চলছে।’

এর আগেও আলোচনায় এসেছিলেন রিপন মিয়া। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে একটি টেলিভিশনের প্রতিবেদনে রিপনের মা অভিযোগ করেছিলেন, ‘খুব কষ্ট করে মানুষ করছি। কিন্তু এখন পরিচয় দেয় না। আমরা গরিব। পরিচয় দিলে যদি ওর মানসম্মান না থাকে!’ খবরে বলা হয়, জনপ্রিয়তার চূড়ায় ওঠা রিপন এখন মা-বাবার সঙ্গে থাকেন না; আলাদা পাকা বাড়িতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকেন, মা-বাবাকে ভরণপোষণ দেন না। সংবাদ প্রচারের পরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। কেউ লিখেছেন, ‘খ্যাতি মানুষকে মানুষ থাকতে দেয় না।’ আবার কেউ মন্তব্য করেছেন, ‘মায়ের কষ্টের কান্না শুনে রিপনের ভিডিও দেখা যায় না।’ তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে রিপন জানিয়েছিলেন, সচ্ছলতার কারণে অনেকের কাছে চক্ষুশূল হয়েছেন। এ ঘটনা তারই বহিঃপ্রকাশ।