সরকারবিরোধী কিছুই পায়নি পুলিশ, তবু যে ধারায় কারাগারে নারী উদ্যোক্তা

ময়মনসিংহের ভালুকায় ফেসবুক লাইভে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমালোচনা করে ক্ষোভ প্রকাশ করায় আটক নারী উদ্যোক্তা সাথী আক্তারকে (৩০) ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারায় (প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা) গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে তাকে ১৫১ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে ময়মনসিংহ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠায় পুলিশ। বিকাল ৩টার দিকে ময়মনসিংহের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক সাজেদুল ইসলাম তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। বিষয়টি বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন ময়মনসিংহ আদালতের পরিদর্শক মোস্তাছিনুর রহমান।

সাথী আক্তার ভালুকা উপজেলার স্কয়ার মাস্টারবাড়ি এলাকার খাদিজা প্যালেস মার্কেটে অবস্থিত ‘সাথী বিউটি পার্লার’-এর মালিক এবং স্থানীয় বাসিন্দা আমজাদ আলীর মেয়ে। গতকাল রবিবার বেলা ২টার দিকে ‘সাথী মেকওভার’ নামের ফেসবুক আইডি থেকে দুটি লাইভ করেন তিনি। এতে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমালোচনা করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ নিয়ে ওই দিন রাতে বিএনপির নেতাকর্মীদের উত্তেজনার মুখে তাকে আটক করে পুলিশ।

লাইভে তিনি বলেছেন, সম্প্রতি তার দুটি শোরুম এবং আশপাশের কয়েকটি দোকানের বিদ্যুতের তার ও এসির তার চুরি হয়েছে। এ ছাড়া তার বাসা থেকেও মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি হয়েছে। এসব ঘটনায় তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি ভোট দেওয়া নিয়ে অনুশোচনা করেন এবং বিএনপি সরকারের সমালোচনা করেন। একপর্যায়ে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘বিএনপি সরকারকে ভোট দিয়া আজকে ভুক্তভোগী।’ তার লাইভটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

রবিবার রাত ৮টার দিকে বিএনপি নেতাকর্মীরা সাথীর পার্লারে গিয়ে তার বক্তব্যের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। এ সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পার্লারে ভাঙচুরের আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে ভালুকা মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং সাথীকে হেফাজতে নেয়। এরপর রাতভর থানায় হেফাজতে তাকে রাখা হয়। সোমবার দুপুরে তাকে ১৫১ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ।

১৫১ ধারা কী

ময়মনসিংহ আদালতের পরিদর্শক মোস্তাছিনুর রহমান বলেন, ‘ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারা মূলত পুলিশের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। কোনও ব্যক্তি আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটনের পরিকল্পনা করছেন বলে পুলিশের সন্দেহ হলে সেই অপরাধ প্রতিরোধের জন্য তাকে গ্রেফতার করতে পারে পুলিশ। এ ক্ষেত্রে পুলিশই বাদী হয়ে আইনি ব্যবস্থা নেয়।’

একই কথা বলেছেন ময়মনসিংহ জেলা আইনজীবী সমিতির জ্যেষ্ঠ সদস্য ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এএইচএম খালেকুজ্জামান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সিআরপিসি ১৫১ ধারা হলো সন্দেহজনকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মতো অপরাধ। এটি ৫৪ ধারার চেয়ে একটু শক্ত ধারা। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী ১৫১ ধারার অপরাধ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে বিনা পরোয়ানায় এবং ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়া গ্রেফতারের ক্ষমতা পুলিশের আছে। ওই ধারার মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠিয়েছিল পুলিশ। পরে তাকে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন বিচারক।’

সরকারবিরোধী কিছুই পায়নি পুলিশ, তবু কেন কারাগারে

তবে ওই নারীর ফেসবুক লাইভের ভিডিও পর্যালোচনা করে সরকারবিরোধী কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। ভালুকা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‌‘ওই নারীর ফেসবুক লাইভের পুরো ভিডিও আমি চারবার পর্যালোচনা করেছি। সেখানে সরকারবিরোধী কোনও বক্তব্য বা সরকারের সমালোচনামূলক কিছু পাইনি।’

ওই নারীকে আদালতে পাঠানোর পর দুপুরে ওসি বলেছিলেন, ‘ভিডিওটি প্রকাশের পর মার্কেটের কয়েকজন ব্যবসায়ী কথা বলতে গেলে তাদের সঙ্গে মারমুখী আচরণ করেন ওই নারী। এতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ কারণে ওই নারীকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি তিনি জামিন পাবেন। জামিনে মুক্ত হয়ে এলে ব্যবসা পরিচালনায় কোনও সমস্যা হবে না বলে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা আমাকে আশ্বস্ত করেছেন।’

সরকারবিরোধী বক্তব্য না পাওয়ার পরও কেন তাকে গ্রেফতার দেখানো হলো জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘ওই নারী উদ্যোক্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভে এসে তার মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছে। এখানে কোনও ব্যক্তি কিংবা সরকারকে উদ্দেশ্য করে কোনও কথা বলেননি তিনি। সে কারণে বড় ধরনের কোনও মামলা দায়েরের সুযোগ নেই। উত্তেজিত জনতার হাত থেকে তাকে রক্ষা করার জন্য উদ্ধার করে থানা হেফাজতে রাখা হয়েছিল। দুপুরে ১৫১ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।’