একমাসে ১১ হত্যা: রাজশাহী এখন আতঙ্কের নগরী

হত্যা

রাজশাহী জেলায় গত এক মাসে ১১ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীর হত্যাকাণ্ড। একের পর এক হত্যাকাণ্ডে রাজশাহীবাসী আতঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২৬ মার্চ রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার আমগ্রাম থেকে খোকন ইসলাম ও তিনা খাতুনের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। খোকনের পরিবারের দাবি, পরকিয়া প্রেমের কারণে তাদের সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করে লাশ গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়। কিন্তু পুলিশ তাদের এই দাবিকে গুরুত্বই দেয়নি। ওই ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের হলেও এখন পর্যন্ত তদন্তে খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি।

এ ব্যাপারে দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পরিমল কুমার চক্রবর্তী বলেন, ‘আমরা তদন্ত করে কিছু পাইনি। তাদের শরীরে কোনও আঘাতের চিহ্ন ছিল না। আমরা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করছি।’

আরও পড়ুন: বেড়েছে সিসি ক্যামেরা বিক্রি

এ ঘটনার তিন দিনের মাথায় (২৯ মার্চ) দুর্গাপুর উপজেলার পানানগর গ্রামে নাসির প্রমাণিক নামে এক কাপড় ব্যবসায়ীকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন দুজনকে আটক করে পুলিশ।’

১ এপ্রিল রাজশাহী মহানগরীর রাজপাড়া থানার চান্না সাঁকো নামক এলাকায় একটি ব্রিজের নিচের ড্রেন থেকে রাসেল আলী নামে এক যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। রাসেলের পরিবারের সদস্যদের দাবি, পারিবারিক কলহের জের ধরে রাসেলকে তার স্ত্রী শরীফা এবং তার আগের স্বামীর পক্ষের ছেলেরা হত্যা করেছে। হত্যার পর ঘটনা ধামাচাপা দিতে তারা লাশ ড্রেনে ফেলে রেখে যায়।

৯ এপ্রিল রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার সাঁইধারা গ্রামে পূর্ব বিরোধের জেরে চাচার হাতে খুন হন রহিদুল ইসলাম (২৮) নামে এক ব্যক্তি। ১৭ এপ্রিল সকালে রাজশাহী মহানগরীর শাহমুখদুম থানার বায়া এলাকায় স্ত্রী সাফিয়া বেগমকে (২৫) হত্যা করে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন আইনাল হক নামে এক ব্যক্তি।

২২ এপ্রিল রাজশাহী মহানগরীর হোটেল নাইস ইন্টারন্যাশনাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর পরদিন সকালেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এএফএম রেজাউল করিমকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

আরও পড়ুন: লক্ষ্মীপুরে গুলিবিদ্ধ দু’জনের লাশ উদ্ধার

২৪ এপ্রিল বিকালে নিজ চেম্বারের সমানে রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক প্রশাসক ও জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ জিয়াউল হক টুকুকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

২৫ এপ্রিল তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া সংঘর্ষে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়।

হত্যা ছাড়াও ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটছে এই মহানগরীতে। ২৩ মার্চ রাতে এক কিশোরীকে গণধর্ষণ করে তার কথিত প্রেমিক ও তার প্রেমিকের বন্ধুরা।

এ প্রসঙ্গে রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, ‘রাজশাহীর সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। আমাদেরও মনে হচ্ছে বাসা-বাড়ি, অফিস-আদালতে, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান কোনও জায়গাই নিরাপদ না। এ নিয়ে সদর আসনের সংসদ সদস্যের সঙ্গে কথা বলেছি আমরা। তিনি আমাদের আশ্বস্থ করেছেন।’

এদিকে সংবাদ সম্মেলন করে রাজশাহীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা। তিনি বলেন, ‘রাজশাহীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। একের পর এক খুন আতঙ্কিত করে তুলেছে শান্ত রাজশাহীকে। এ নিয়ে আমি শিগগিরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবো।’

রাজশাহী নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মহানগর পুলিশের কমিশনার মো. শামসুদ্দিন বলেন, ‘রাজশাহীতে পর পর তিনদিন চারটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনাগুলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে খুব বেশি প্রভাব ফেলেছে বলে আমি মনে করি না। তবে অধ্যাপক সিদ্দিকী হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি একটু আলাদা। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। ইতোমধ্যেই সন্দেহভাজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্ত কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’

আরও পড়ুন: শুধু বেতন নয়, ভাতার ওপরও কর দিতে হবে

রাজশাহীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে আছে দাবি করে পুলিশ সুপার (এসপি) নিশারুল আরিফ বলেন, ‘সম্প্রতি কয়েকটি উপজেলায় যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে সেগুলোর প্রায় সবই ‘ক্লু’ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আমরা কয়েকজনকে আটকও করেছি। আশা করছি, অল্প সময়ের মধ্যে এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বাকিদেরও আটক করা সম্ভব হবে।’

 

/এসটি/এএইচ/