পুলিশ জানিয়েছে, হত্যার কারণ ও হত্যাকারী সম্পর্কে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। লাশ উদ্ধার করে ময়নাদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ, র্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। কারা বা কেন নিত্যারঞ্জনকে হত্যা করেছে তা নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিত্যরঞ্জন পান্ডে হত্যার মিল রয়েছে। একই কায়দায় তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে পুলিশ।
দেশজুড়ে জঙ্গি দমনে পুলিশের সাত দিনের ‘সাঁড়াশি অভিযানের’ প্রথম দিন সকালেই খুন হলেন ৬০ বছর বয়সী নিত্যরঞ্জন পান্ডে। ঝিনাইদহে হিন্দু পুরোহিত হত্যার এক সপ্তাহ পার না হতেই শুক্রবার সকাল সাড়ে ৫টার দিকে পাবনা সদর থানার হেমায়েতপুরে পাবনা মানসিক হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।
হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে শহরে মানববন্ধন হয়েছে। হত্যাকারী দুর্বৃত্তদের গ্রেফতারে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে মানববন্ধনে বলা হয়, সৎসঙ্গ সেবাশ্রমের প্রায় শতাধিক সেবক চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন।
নিহত নিত্যরঞ্জন পান্ডে গোপালগঞ্জ জেলার সদরের আরুয়া কংশু গ্রামের মৃত রশিক লাল পান্ডের ছেলে। তিনি প্রায় ৪০ বছর ধরে পাবনার ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র আশ্রমে সেবক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
পাবনার সহকারী পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সেলিম খান জানান, শুক্রবার ভোর ৫টার দিকে পাবনা শহর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে নিত্যরঞ্জন পান্ডেকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। সৎসঙ্গ আশ্রম থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে পাবনা মানসিক হাসপাতালের উত্তর পাশের প্রধান গেটে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত নিত্যরঞ্জন পান্ডে সৎসঙ্গ সেবাশ্রমে ৪০ বছর ধরে কাজ করে আসছিলেন। তিনি ডায়াবেটিসের রোগী ছিলেন। প্রতি দিনের মতো শুক্রবার সকালে হাঁটতে বেরিয়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তিনি।
পুলিশ সুপার আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের ধরন দেখে মনে হচ্ছে, খুনিরা দেহ থেকে তার মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে চেয়েছিল। হত্যাকাণ্ডের সময় সেখানে লোক সমাগম না থাকলেও খুনিরা এক থেকে দেড় মিনিটের মধ্যেই মিশন শেষ করেছে পালিয়ে গেছে।
৭ জুন ঝিনাইদহে হিন্দু পুরোহিত আনন্দ গোপাল গাঙ্গুলী, ৫ জুন নাটোরে খ্রিস্টান দোকানি সুনীল গোমেজ এবং একই দিনে চট্টগ্রামে পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার মিতু হত্যার সঙ্গে পাবনার এ খুনের অনেক মিল রয়েছে বলে পুলিশ দাবি করেছে।
হেমায়েতপুরের শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র সৎসঙ্গ আশ্রমের সাধারণ সম্পাদক যুগল কিশোর ঘোষ জানান, প্রায় ৪০ বছর ধরে এই আশ্রমে আশ্রিত থেকে নিত্যরঞ্জন ধর্ম সেবা দিয়ে আসছিলেন। ডায়াবেটিস ছিল বলে প্রতিদিন সকালে তিনি হাঁটতে বের হতেন। আজও হাঁটতে বেরিয়ে খুন হয়ে গেলেন।
আশ্রমের নির্বাহী পরিষদের সদস্য শ্রীবলাই কৃষ্ণ সাহা জানান, নিত্যরঞ্জন আশ্রমের সবচেয়ে দায়িত্বশীল ও কর্মনিষ্ঠ সেবক ছিলেন। তার সঙ্গে কারও শত্রুতা ছিল বলে তাদের জানা নেই। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে যে ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটছে এটিকে তেমনই মনে হচ্ছে।
স্থানীয় এনজিও কর্মী নরেশ মধু বলেন, উনি দীর্ঘদিন ধরে এ এলাকায় বসবাস করে আসছিলেন। এ এলাকারই মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন। সৎসঙ্গ সেবাশ্রমে কাজ করতেন। সাদামাটা মানুষ, কোনও শত্রু ছিল বলে শুনিনি।
পাবনা পুলিশ সুপার আলমগীর কবির জানান, হত্যাকাণ্ডের কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে আশ্রমের কমিটি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ এবং জঙ্গিদের বিষয়টি সামনে রেখে তদন্তের কাজ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা সব সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখব। এটা জঙ্গিদের কাজ কি না এখনই সে রকম কিছু বলা যাবে না।’
তদন্ত কমিটি গঠন
নিত্যরঞ্জন পান্ডে হত্যার ঘটনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লিটন কুমার দাসকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন পাবনা সহকারী পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সেলিম খান, সদর থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল হাসান ও দুই এসআই। তদন্ত কমিটিকে ৭ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
ভারতীয় কূটনীতিকের ঘটনাস্থল পরিদর্শন
ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। শুক্রবার দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার অভিজিৎ চট্টপাধ্যায় হেমায়েতপুর শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র সেবাশ্রমে আসেন। তিনি সেবাশ্রমের কর্মকর্তা ও নিহত নিত্যরঞ্জন পান্ডের শ্বাশুড়িসহ স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তিনি নিহতের পরিবারকে সব ধরনের সহযোগিতা ও সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেন।
এর আগে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন র্যাব-১২- এর সিও (ডিআইডি) শাহাবুদ্দিন আহমেদ। এ সময় জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সৎসঙ্গ সেবাশ্রমের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে মানববন্ধন
শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে পাবনা টাউন হল মুক্তমঞ্চের সামনের সড়কে পাবনা জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ ও হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ব্যানারে এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে মানববন্ধন হয়েছে। হত্যাকারী দুর্বৃত্তদের গ্রেফতারে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, সৎসঙ্গ সেবাশ্রমের প্রায় শতাধিক সেবক চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। মানববন্ধনে বক্তাব্য দেন জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি চন্দন কুমার চক্রবর্তী, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের বিনয় জ্যোতি কুন্ডু, ছাত্র যুব ঐক্য পরিষদের সাধারণন সম্পাদক অমিত কুমার কুন্ডু প্রমুখ।
বক্তারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাহীনতায় জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন ব্যর্থ উল্লেখ করে পাবনার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের অপসারণ দাবি করেন।
/এফএস/এজে