৩৪ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি জয়পুরহাট চুনাপাথর প্রকল্প

অর্থনৈতিক সার্ভে আর বৈদেশিক বিনিয়োগের অভাবে ৩৪ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি জয়পুরহাটের চুনাপাথর প্রকল্প। বাংলাদেশ মিনারেল এক্সপ্লোরেশন ডেভলপমেন্ট করপোরেশন ১৯৮১ সালে প্রথম ধাপে প্রকল্পের ২১টি কুপ খনন করে ফিজিবিলিটি স্টাডি করে।Joypurhat-Pic-1

এরপর ১৯৮২ সালে দ্বিতীয় ধাপে শ্যাপ্ট কন্সট্রাকশনের মাধ্যমে প্রতিদিন ৫ হাজার ৫শ টন চুনাপাথর উত্তোলন করা যাবে বলে সংস্থাটির রিপোর্টে বলা হয়, যার ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৫৯ কোটি টাকা।

অর্থনৈতিক সহযোগিতার আশ্বাসে ওই প্রকল্প শুরু হলেও পরবর্তীতে সহায়তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়, সৌদি আরব। আর তারপর থেকেই প্রকল্পটি আর আলোর মুখ দেখেনি। 

জানা গেছে, ১৯৬৩ সালে জয়পুরহাট চুনাপাথর খনি আবিষ্কারের পর প্রকল্প উন্নয়নের জন্য ১৪২ একর জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়। জিওলজিক্যাল সার্ভে অব পাকিস্তান (জিওপি) ১৯৬৪ সালে জয়পুরহাট চুনাপাথর প্রকল্পে প্রথম কাজ শুরু করে। সে অনুযায়ী, ১৯৬৫ সালে জার্মানির ফ্রাইড ক্রপ রোস্তোফি নামের একটি সার্ভে কোম্পানি প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা (ফিজিবিলিটি) যাচাই করে। পরে ওই কোম্পানি ১৯৬৬ সালের নভেম্বর মাসে তাদের সার্ভে রিপোর্ট দাখিল করে।

রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, জয়পুরহাটের খনিতে চুনাপাথর আছে ৫১৩ থেকে ৫৭০ মিটার গভীরে। ৬ দশমিক ৭ বর্গকিলোমিটার জায়গা জুড়ে খনিতে মজুদ রয়েছে প্রায় ১০০ মিলিয়ন টন উন্নত চুনাপাথর।

পরবর্তীতে ইউকে’র পাওয়েল ডাফরিন নামের একটি সার্ভে কোম্পানি টেকনিক্যাল সার্ভে সম্পন্ন করে ১৯৬৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাদের রিপোর্ট দেয়। ওই রিপোর্টের ভিত্তিতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ১৯৬৯ সালের অক্টোবর মাসে প্রকল্পটি অনুমোদন করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলেও বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে সেই উদ্যোগ থেমে যায়।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর বছরে এক মিলিয়ন টন চুনাপাথর আহরণের জন্য ১৯৭৪ সালে প্রকল্প উন্নয়নের কাজ শুরু হয়, যার ব্যয়ভার নির্ধারিত হয় প্রায় ৫৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রার আশ্বাস মিললেও বরাদ্দ না পাওয়ায় থেমে যায় এর সব কার্যক্রম।

১৯৭৮ সালে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান সিমেন্টেশন মাইনিং ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড প্রশাসনিক ভবন নির্মাণসহ প্রকল্পের কাজ শুরু করে। আর এ কাজে বিনিয়োগের আশ্বাস দেয় সৌদি সরকার। সে সময় খনির উন্নয়নে অবকাঠামোগত ভবন ও নির্মাণ করা হয়।Joypurhat-Pic-03

প্রকল্প উন্নয়নে নির্ধারিত ১৫৯ কোটি টাকার মধ্যে ১১৯ কোটি টাকা দেওয়ার আশ্বাস দেয় সৌদি সরকার। সে মোতাবেক কাজও শুরু হয়, যার ধারাবাহিকতায় ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ মিনারেল এক্সপ্লোরেশন ডেভলপমেন্ট করপোরেশন (বিএমইডিসি) দুটি ধাপে চুনাপাথর উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু করে। উন্নয়ন প্রকল্পে প্রথম ধাপে ২০/২১টি কুপ খনন করে খনিতে পুরোপুরি সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। এ জন্য ব্যয় হয় ১২ কোটি ৯০ লাখ টাকা। আর দ্বিতীয় ধাপে শ্যাপ্ট কনস্ট্রাকশনের মাধ্যমে প্রতিদিন সাড়ে ৫ হাজার টন চুনাপাথর উত্তোলনে সার্বিক জরিপ কাজও সম্পন্ন করা হয়।

ওই জরিপে জানা গেছে, জয়পুরহাট চুনাপাথর প্রকল্পে ভূগর্ভের তাপমাত্রা ৪২ থেকে ৪৪ ডিগ্রি, যেখানে ৫১৫ থেকে ৫৬০ মিটার গভীরতায় চুনাপাথর  মজুদ আছে। কিন্তু সার্বিক জরিপ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর সে সময় অজ্ঞাত কারণে সৌদি সরকার অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। সেই থেকে এর সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে আছে।

সরেজমিন জানা গেছে,এ প্রকল্পে অধিগ্রহণ করা ১৪২ একর জমির মধ্যে বর্তমানে জমি আছে প্রায় ৫৯ একর। বাকি জমি মহিলা গার্লস ক্যাডেট,মাইনিং মিনারেলজি অ্যান্ড মেটালার্জি ইনস্টিটিউট,কিশোর সংশোধন কেন্দ্রকে দেওয়া হয়েছে।

জরিপ অনুযায়ী, এই ৫৯ একর জায়গার নিচে রয়েছে চুনাপাথরের খনি। অথচ ১৯৮২ সাল থেকে চুনাপাথর প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এখনও দায়িত্ব পালন করছেন একজন প্রকল্প ব্যবস্থাপকসহ ১৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। প্রতি মাসে তাদের বেতন-ভাতা বাবদ আড়াই লাখ টাকা দেওয়া হচ্ছে বলে জানান জয়পুরহাট চুনাপাথর খনি ও সিমেন্ট প্রকল্পের হিসাব সহকারী মোখলেছুর রহমান।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খনি থেকে বর্তমানে চুনাপাথর আহরণ করতে হলে আর কোনও জরিপের প্রয়োজন হবে না। শুধু চুনাপাথর আহরণে কনসালট্যান্ট ফার্ম দিয়ে অর্থনৈতিক সার্ভের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা নির্ধারণ করেই এর কাজ শুরু করা সম্ভব, যা থেকে খনি প্রকল্পের ১৩ দশমিক ২ বর্গ কিলোমিটার থেকে ২৬ বছরে ৪৫ মিলিয়ন টন চুনাপাথর আহরণ করা সম্ভব।

জয়পুরহাট সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আ স ম মোক্তাদির তিতাস বলেন, জয়পুরহাট খনির চুনাপাথর বিশ্বমানের। কিন্তু খনি উন্নয়নে কার্যকরী কোনও ব্যবস্থা না নেওয়ায় বছরের পর বছর এর অধিগ্রহণ করা জমিগুলো খালি পড়ে আছে।

জামালগঞ্জ সিবিএম স্টাডি কয়লা খনি প্রজেক্ট মনিটরিং কনসালট্যান্ট ও পেট্রোবাংলার সাবেক চেয়ারম্যান মর্তুজা আহম্মদ ফারুক বলেন, জয়পুরহাটে ১৯৬৩ সালে চুনাপাথর আবিষ্কৃত হওয়ার পর এই খনি উন্নয়নে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিবারই বৈদেশিক বিনিয়োগের অভাবে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। অথচ এই চুনাপাথর প্রকল্প উন্নয়নের জন্য যে সমস্ত আর্থ কারিগরি রিপোর্ট তৈরি করা দরকার,ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং স্টাডি দরকার তার সবকিছুই সম্পন্ন হয়েছে।

তিনি আরও বলেন,১৯৮২ সালে এই খনি উন্নয়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৫৮ কোটি টাকা। কিন্তু এখন ওই ব্যয়ে এ কাজ করা সম্ভব নয়। এখন বিদেশি কোনও বিশেষজ্ঞ ফার্ম অথবা বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিয়ে এর সম্ভাব্যতা ব্যয় নিরূপণ করে কাজ শুরু করা গেলে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই জয়পুরহাটের এই খনি থেকে চুনাপাথর উত্তোলন করা সম্ভব।

আরও পড়ুন: মানিকগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় মা-মেয়েসহ নিহত ৪ 

/এসএনএইচ/এবি/আপ-এআর/