পলাতক রেজা কমান্ডারকে ঘিরে চলছে সমালোচনার ঝড়

জাল ও ভুয়া সনদ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা পোষ্য কোটায় চাকরি নেওয়ার অপরাধে সিরাজগঞ্জের ১৯ পুলিশ কনস্টেবল দুদকের হাতে পাবনায় গ্রেফতারের বিষয়টি, সিরাজগঞ্জ জেলার সর্বত্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। মঙ্গলবার ও বুধবার একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর, অমুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে ভুয়া ও জাল সনদ দেওয়ার এই চক্রের মূল হোতা ‘দাপুটে’ শহীদুর রেজাকে নিয়ে, নতুন করে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনার ঝড় শুরু হয়েছে। সিরাজগঞ্জের বেলকুচির সাবেক বিতর্কিত উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সোনালী ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এই ‘রেজা কমান্ডার’ ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছেন।

রেজা কমান্ডারের বিলাশবহুল পাঁচতলা দালানের একাংশ

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বেলকুচি থানার ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার নজরুল ইসলাম বলেন, ভুয়া সভা আহবান ও আমাদের জাল স্বাক্ষরে রেজুলেশন করে কমান্ডার লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে রেজা এসব অমুক্তিযোদ্ধাদের পোষ্যদের চাকরি দিয়েছে। ভুয়া ও জাল সনদ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা পোষ্য কোটায় ২০১২ সালে পুলিশ বিভাগে ১৯ জনের চাকরী নেওয়ার বিষয়টি আমরা টের পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে জেলা ও কেন্দ্রকে জানাই। আমাদের ধারণা শহীদুর রেজা এরকম আরও অনেক অমুক্তিযোদ্ধার পোষ্যদের অবৈধ সুযোগ দিয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার গাজী সফিকুল ইসলাম সফি বলেন, আমি জেলা ইউনিট কমান্ডারের দায়িত্ব নেওয়ার পর বেলকুচি উপজেলা কমান্ডার শহীদুর রেজার নানাবিধ দুর্নীতি ধরা পড়ে। তার বিরুদ্ধে বিশেষ কমিটি করে তদন্ত করি। তার বিরুদ্ধে ভুয়া ও জাল মুক্তিযোদ্ধার সনদ বিক্রির বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে, আমি নিজেও দু’বার কেন্দ্রে গিয়ে অভিযোগ দাখিল করি। এরপর তাকে কেন্দ্রের নির্দেশে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সে দীর্ঘদিন নানা অসৎ পন্থায় পদ আঁকড়ে ছিল।

এদিকে, দুদক গত সোমবার বিকেলে পাবনা জেলা সদর থেকে সিরাজগঞ্জের ১৯ পুলিশ সদস্যদের গ্রেফতারের পর কর্মকর্তরা বিশেষ এক ধরনের চাপে রয়েছেন বলে জানা গেছে। বুধবার দুপুরে দুদক পাবনা অঞ্চলের আঞ্চলিক উপ-পরিচালক আবু বকর সিদ্দিকী আক্ষেপ করে বলেন, ‘সাংবাদিকদের সাথে এখন কথা বলাটাই বিপদ। এত বড় একটা অ্যাচিভমেন্ট, সেখানে পুরস্কার পাওয়া তো দূরের কথা, বরং তিরস্কার পাচ্ছি।’ কিন্তু কাদের পক্ষ থেকে তিরস্কার, সে বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেননি।

গ্রেফতারকৃত ১৯ পুলিশ কনস্টেবলঅন্যদিকে, জাল ও ভুয়া সনদ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা পোষ্য কোটায় চাকরি গ্রহনের অপরাধে দুদকের হাতে সোমবার গ্রেফতার হওয়া সিরাজগঞ্জের ১৯ পুলিশ কনস্টেবল গ্রেফতারের পর আদালতের মাধ্যমে পাবনা জেলা কারাগারে পাঠনো হয়েছে। পাবনা জেলার আদালত পরিদর্শক শামসুল আলম জানান, সোমবার গ্রেফতারের পর পরই বিকেলে ১৯ কনস্টেবলদের মুখ্য বিচারিক হাকিম মো. নাজিমুদ্দোলার আদালতে হাজির করার তাদের পাবনা জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। যেহেতু মামলাটি সিরাজগঞ্জ সদর থানার, তাই খুব শিগগিরই আদালতের প্রক্রিয়া শেষে তাদের সিরাজগঞ্জ পাঠানো হবে।
প্রসঙ্গত, ২০১২ সালে সিরাজগঞ্জ জেলার পুলিশ বিভাগে মুক্তিযোদ্ধা পোষ্য কোটায় ভুয়া ও জাল সনদ দিয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষানবিশ ওই ১৯ কনস্টেবলের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে সিরাজগঞ্জ সদর থানায় মামলাটি রুজু করেন সাবেক রিজার্ভ অফিসার (আরও) উপ-পরিদর্শক নুরুল ইসলাম। শুরুতে সদর থানা পুলিশ মামলাটির তদন্ত করলেও বর্তমানে দুদক এটির তদন্ত করছে। মুক্তিযোদ্ধার জাল সনদ প্রদানে চক্রের মূল হোতা হিসেবে বেরিয়ে এসেছে শহীদুর রেজা ওরফে রেজা কামান্ডারের নাম। জেলায় বিলাসবহুল জীবন যাপনের অধিকারী এই ব্যক্তি পাঁচতলা বাড়িসহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পত্তির মালিক বলে জানা যায়।
অভিযুক্ত কনস্টেবলদের ১৯ জনের ১৭ জন বেলকুচি এবং বাকী দু’জন শাহজাদপুর ও সদর উপজেলার ঠিকানা ব্যবহার করেছেন। গ্রেফতারের পর স্বজনরা এখন স্থানীয় লোকজন এবং মিডিয়ার কাছে রেজার বিষয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন।

/এইচকে/

আরও পড়ুন: মুক্তিযোদ্ধা সনদ জালকারীদের হোতা ‘কমান্ডার’ শহীদুর রেজা