তিনতলা বাড়ির প্রত্যেক তলায় রয়েছে চারটি করে রুম। নিজে থাকার পর বাকি রুম তিনি ভাড়া দিয়েছেন। তার আরও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। মাঠকর্মী হিসেবে সোনালী ব্যাংকে চাকরি করা রেজা কিভাবে এই সম্পত্তির মালিক হলেন তা নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন রয়েছে।
কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও রেজার সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেলকুচি উপজেলা সদরের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয় সংলগ্ন সোনালী ব্যাংকের সিবিএ’র সাবেক জেলা সভাপতি রেজার বাড়ি ছিল সব অপকর্ম ও অনিয়মের কেন্দ্র। অমুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে ভাতা আত্মসাৎ,মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদ সরবরাহ, সহকর্মীদের অন্ধকারে রেখে বাড়িতে ভুয়া সভা দেখিয়ে গঠনতন্ত্রের পরিপন্থী রেজুলেশন তৈরি, গেজেট বা লাল বই সংশোধন করে অমুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া- সব অপকর্মের হোতা এই শহিদুর রেজা। গত ২৭/২৮ বছর ধরেই চলেছে তার এসব অপকর্ম।
বেলকুচি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নিজস্ব অফিস না থাকায় তার বাড়িটি ইউনিট অফিস হিসেবে ব্যবহার করা হতো। যখন যে দল ক্ষমতায় আসতো, সে দলের প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দ, জেলা ইউনিট ও কেন্দ্রের সঙ্গে সখ্যতা রক্ষা করে কমান্ডার রেজা নিজের চেয়ারটা আঁকড়ে রাখতেন। তাই কেউ তার বিরুদ্ধাচারণ করতে সাহস পেতো না।
চাকরি হওয়ার পর ওই ১৯ শিক্ষানবিশ কনস্টেবলের বাবার সনদ তদন্ত করার জন্য মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে পাঠালে রেজার আসল চেহারা বের হয়ে আসে। তখনই তার অপকর্ম ফাঁস হতে থাকে। সহকর্মীরা ধীরে ধীরে তাদের মুখ খুলতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত জেলা ইউনিট কমান্ড ও কেন্দ্রে কয়েক দফা অভিযোগের পর এক বছর আগে রেজাকে বরখাস্ত করা হয়। এরইমধ্যে ভুয়া সনদ দিয়ে চাকরি নেওয়া ওইসব শিক্ষানবিশ পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা হলে দুদক গত সোমবার পাবনা থেকে ১৯ জনকে গ্রেফতার করে। ঘটনার পর রেজা গা ঢাকা দিলেও দুদক তাকে এখনও ধরতে পারেনি।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলা ইউনিট কার্যালয়ে গেলে রেজার সহকর্মীরা নানা অভিযোগ করেন। এ সময় রেজার বাড়িতে গেলে তাকে বা তার পরিবারের কোনও সদস্যকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়।
বেলকুচি উপজেলা ইউনিট কমান্ড অফিসে থাকা বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী আব্দুল খালেক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বেলকুচিতে মুক্তিযোদ্ধাদের অফিস ছিল মূলত রেজার বাসায়। সেখানে বসেই সব ধরনের অপকর্ম করেছেন তিনি। সহকর্মী গাজী আব্দুর রশিদ বলেন, সোনালী ব্যাংক বেলকুচির সোহাগপুর শাখায় মাঠকর্মীর দায়িত্বে থাকাকালীন ৫২ জন মুক্তিযোদ্ধার ভাতা তুলে আত্মসাৎ করেন রেজা।
গাজী আব্দুল মতিন বলেন, অমুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে ভাতা প্রদান ও পোষ্য কোটায় তাদের ছেলে-মেয়েদের চাকরির সুযোগ করে দিতে রেজা তাদের ভুয়া সনদ ও প্রত্যয়নপত্র দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
ওই সময়ে অফিসে তার সহকর্মী ছিলেন গাজী আব্দুর রহমান বিএসসি। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে রেজা বেলকুচিতে শতাধিক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছেন বলে আমাদের ধারণা। লাল বইয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২৭৬ জন হলেও পরবর্তীতে ২০০৪ ও ২০১০ সালে গেজেট সংশোধন করার পর বর্তমানে ৩২২ জন ভাতা পাচ্ছেন। এদের মধ্যে রাজাপুর ইউনিয়নের শমেসপুর গ্রামে রেজার মূল বাড়ির আশেপাশেই অন্তত ১০/১৫ জন রয়েছেন।
আরেক সহকর্মী গাজী আব্দুল মালেক তালুকদার বলেন, রেজা বরাবরই ধূর্ত প্রকৃতির ছিলেন। আমার জানামতে, লাখ লাখ টাকা নিয়ে বেলকুচিতে ১০/১২ জনকে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছেন তিনি।
বেলকুচির ভারপ্রাপ্ত ইউনিট কমান্ডার নজরুল ইসলাম বলেন, রেজার দুর্নীতি ও অনিয়মের কথা বলে শেষ করা যাবে না। আগে আমরা এতোকিছু টের পাইনি। পুলিশ কনস্টেবলদের ভুয়া ও জাল সনদের বিষয়টি ধরা পড়ার পর আমরা ধীরে ধীরে তার ব্যাপারে জানতে পারছি।
জেলা ইউনিট কমান্ডার গাজী সফিকুল ইসলাম সফি বলেন, এর আগে দুইবার ভুয়া ও জাল সনদের বিষয়টি ধরা পড়ায় রেজা ক্ষমা চেয়েছেন। পরে কেন্দ্রীয় কাউন্সিলকে জানালে তাকে বরখাস্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।
সোনালী ব্যাংক বেলকুচির সোহাগপুর শাখার ব্যবস্থাপক উদয় কুমার দত্ত বলেন, শহিদুর রেজা মাঠকর্মী হিসেবে আশির দশকে চাকরিতে যোগ দেন। চাকরি জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি বেলকুচির এ শাখায় ছিলেন। ক্লার্ক পদে চাকরি করলেও বরাবরই তার দাপট ছিল। শেষজীবনে জুনিয়র অফিসার হিসেবে পদোনতি পান তিনি।
পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহম্মদ বলেন, এ বিষয়ে মামলা হওয়ার পর দুদক তদন্তভার নেওয়ার আগে আমাদের একজন এসআই এর তদন্ত করেন। তাদের তদন্তেও রেজার অভিযুক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়। সেজন্য গত দুই মাস আগে রেজাকে এ মামলায় অভিযুক্ত করতে চিঠির মাধ্যমে আমরা দুদক উপ-পরিচালককে পরামর্শ দিয়েছি।
দুদক পাবনা-সিরাজগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আবু বকর সিদ্দিকী অবশ্য বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বলেন, সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার আমাকে এ ধরনের পত্র দিয়েছেন কিনা তা জানা নেই।
প্রসঙ্গত, ভুয়া ও জাল মুক্তিযোদ্ধা সনদে পোষ্য কোটায় চাকরি নিয়ে গত সোমবার পাবনায় দুদকের হাতে গ্রেফতার হন সিরাজগঞ্জের বেলকুচি,শাহজাদপুর ও সদর উপজেলার ১৯ শিক্ষানবিশ পুলিশ কনস্টেবল।
গ্রেফতারের পর থেকে তারা পাবনা কারাগারে রয়েছেন। সিরাজগঞ্জের কোর্ট ইন্সপেক্টার মো. শহিদুল্লাহ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বলেন, এখনও তারা সিরাজগঞ্জ আসেননি।
/এমএসএম/আপ-এবি