‘চোখের দৃষ্টি নেই বলে থেমে নেই আমার শিক্ষা,
কর্মসংস্থান চাই আমি, চাই না করুণা ভিক্ষা।
চোখের আলো নেই বলে হইনি আমি নিঃস্ব,
শিক্ষার আলো নিয়ে আমি জয় করিব বিশ্ব।’
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সুমাইয়া আক্তারের স্বরচিত কবিতার এই চারটি লাইনই প্রমাণ করে শিক্ষার প্রতি তার প্রবল আগ্রহের কথা। জন্ম থেকেই সে দৃষ্টিহীন হলেও শিক্ষার আলো দিয়ে জয় করে এসেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা স্তর। এবার পালা উচ্চশিক্ষার। তাতেও দমেনি এই অদম্য মেধাবী। ভর্তি পরীক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘খ’ ইউনিটে অংশ নিয়ে ৩৯৭ স্কোর সংগ্রহ করেছে সুমাইয়া। তার অদম্য ইচ্ছা শক্তি আর অক্লান্ত পরিশ্রম শিক্ষাক্ষেত্রের প্রতিটি স্তরকে আলোকিত করলেও উচ্চশিক্ষায় এখন বাধ সেধেছে দরিদ্রতা। পড়ালেখা চালানোর মতো কোনও সামর্থ্য নেই তার পরিবারের।
সুমাইয়া আক্তার জয়পুরহাট পৌরসভার নতুন হাট এলাকার রফিকুল ইসলামের মেয়ে। এক ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সুমাইয়া সবার বড়। জন্ম থেকে সে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হলেও পড়ালেখায় খুব মেধাবী। দেড় শতক জমির ওপর বসত-ভিটায় জীবন কাটছে তাদের পরিবারের। বাবা রফিকুল ইসলাম একটি সিগারেট কোম্পানিতে চাকরি করে যে আয় করে তাই দিয়ে সংসার চলে তাদের। দরিদ্রতা ও শারীরিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও সুমাইয়া এবার জয়পুরহাট সরকারি মহিলা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে মানবিক শাখায় জিপিএ-৪.৬৭ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে।
উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর উচ্চতর শিক্ষালাভে সুমাইয়ার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও দরিদ্র বাবা রফিকুল ইসলামের কোনও ইচ্ছা ছিল না মেয়েকে আর পড়ালেখা করানোর। কিন্তু সুমাইয়া তার কলেজের শিক্ষক, সহপাঠীদের সহযোগিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবিক বিভাগে ভর্তি হওয়ার জন্য ‘খ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সম্মিলিত মেধা তালিকায় ৩৯৭ স্কোর সংগ্রহ করেছে। সুমাইয়ার এই ফলাফল চমকে দিয়েছে সবাইকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেলেও আনন্দ নেই তার পরিবারের। দিন যতই ঘনিয়ে আসছে বাবা রফিকুল ততই চিন্তিত হয়ে পড়ছেন। এ অবস্থায় মেয়েকে কীভাবে ভর্তি করাবেন সেই চিন্তায় দিন কাটছে তার।
মেধাবী শিক্ষার্থী সুমাইয়া জানায়, শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই ব্রেইল পদ্ধতির বই ছাড়া ক্লাসে শিক্ষকরা যা পড়াতেন তাই সে শুনে ও রেকর্ড করে নিয়ে এসে বাড়িতে মুখস্ত করতো। টাকার অভাবে কোচিং করতে না পারলেও সহপাঠীদের সরবরাহ করা কোচিংয়ের নোট তার ছোট ভাই কলেজ ছাত্র মিঠু হাসান পড়ে শোনাতো। আর সেগুলো মুখস্থ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সে ওই ফলাফল করেছে। তাই তার ইচ্ছা, সে আর সমাজের বোঝা হয়ে থাকতে চায় না। সে স্বনির্ভর হতে চায়। উচ্চশিক্ষা ছাড়া স্বনির্ভর হওয়া যায় না। এজন্য সুমাইয়া সবার সহযোগিতা চায়।
বাবা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। এটা শুনে সবাই খুশি হলেও আমি রয়েছি দুশ্চিন্তায়। ঢাকায় রেখে মেয়েকে পড়ানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য আমার নেই। চাকরি করে যে টাকা পাই, তা দিয়ে সংসারই চলে না, মেয়ের পড়ালেখার খরচ জোগাবে কিভাবে? এখন আমি কী করবো, ভেবে কোনও কুল কিনারা পাচ্ছি না।’
সুমাইয়ার দাদী আলিফা বেগম বলেন, ‘সুমাইয়ার চার বছর বয়সে মা মারা যায়। তখন থেকে কোলে করে তাকে বড় করেছি। কলেজের পড়া শেষ করে এবার ঢাকায় পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। ওর বাবা টাকা দেবে কোথা থেকে, তারতো সামর্থ্যই নেই।’
জয়পুরহাট সরকারি মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান সহকারী অধ্যাপক তুলসীদাস মোহন্ত জানান, দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও পড়ালেখার প্রতি সুমাইয়ার প্রচণ্ড আগ্রহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় সুমাইয়া যে রেজাল্ট করেছে তা অকল্পনীয়। ওর এই রেজাল্ট অন্য শিক্ষার্থীদেরও অনুপ্রেরণা যোগাবে। পড়ালেখার সুযোগ পেলে সুমাইয়া সমাজের বোঝা নয়, দেশের সম্পদ হবে।
/এআর/টিএন/