বরেন্দ্র অঞ্চলে রোপা আমন ধান কাটা শুরু, বাম্পার ফলনের আশা

14958646_10202380676476061_467855368_nবরেন্দ্র অঞ্চলে শুরু হয়েছে রোপা আমন ধান কাটা-মাড়াইয়ের উৎসব। ধান কাটা, মাড়াই নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষি শ্রমিক ও কৃষকরা। সময়মত বৃষ্টি হওয়ায় এবং আবহাওয়া ভালো থাকায় বাম্পার ফলনের আশা করছেন তারা। এছাড়া ধানের দাম ভালো থাকায় লাভের স্বপ্ন দেখছেন কৃষকরা। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরও জানিয়েছে, এ বছর রোপা আমন উৎপাদনের জন্য সময়মত বৃষ্টি হয়েছে এবং আবহাওয়া অনুকূলে ছিল। এছাড়া ফসলে কোনও ধরনের পোকামাকড়ের আক্রমণ না থাকায় উৎপাদন ভালো হবে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রাজশাহীর অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বরেন্দ্র অঞ্চলে ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারত করা হয়েছিল। এবার হয়েছে ৩ লাখ ৯৫ হাজার ৩০ হেক্টর। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫ হাজার ৩৭০ হেক্টর বেশি জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে।

রাজশাহী জেলায় ৭০ হাজার ২২৪ হেক্টর আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। কিন্তু আবাদ হয়েছে ৭৫ হাজার ৩৩০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ জমিতে রোপা আমন চাষাবাদ হয়েছে গোদাগাড়ী উপজেলায়। গোদাগাড়ীতে মোট ২৫ হাজার ৩৯৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষাবাদ হয়েছে। এরপরে রয়েছে তানোর উপজেলা। তানোরে মোট ২১ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ করা হয়েছে। গত বছর রাজশাহী জেলায় লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬৫ হাজার ৭৩৫ হেক্টর। আর আবাদ হয়েছিল ৭৩ হাজার ৭৩২ হেক্টর জমিতে। সেই হিসেবে এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আমন আবাদ বেড়েছে ৫ হাজার ১০৬ হেক্টর। একইভাবে বরেন্দ্র অঞ্চলের নওগাঁ জেলায় লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৯৬ হাজার ৬৪ হেক্টর। আবাদ হয়েছে ২ লাখ ১ হাজার ৪৬৫ হেক্টর জমিতে। নাটোর জেলায় ৫৫ হাজার ৬০০ হেক্টরে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদ হয়েছে ৬৫ হাজার ৪৯০ হেক্টর জমিতে। আর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় আমনের আবাদ হয়েছে ৫২ হাজার ৭৪৫ হেক্টর জমিতে।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফুল্লাহ জানান, সবেমাত্র ধান কাটামাড়াই শুরু হয়েছে। মোট ধানের ৫ থেকে ১০ শতাংশ কর্তন করা হয়েছে। এতেই দেখা গেছে হেক্টর প্রতি তিন দশমিক শূন্য সাত মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হচ্ছে। তবে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ধান কর্তনের পর উৎপাদন কেমন হচ্ছে তার মোটামুটি পরিমাপ করা যাবে।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ পরিচালক দেব দুলাল ঢালী বলেন, সময়মত বৃষ্টি ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ধানের উৎপাদন ভালো হবে বলে আশা করা যায়। আমি নিজে কৃষকদের সামনে উপস্থিত থেকে ক্রপ কাটিং করে দেখেছি বিঘাপ্রতি প্রায় ১৮ মণ করে ধান উৎপাদন হচ্ছে। তবে শুরুতে ফলন কিছুটা কম হলেও পরের দিকে ধানে ফলন বাড়তে দেখা যায়।

তিনি আরও জানান, গত দুই তিন বছর ধরে রোপা আমন ধানে ‘বাদামী গাছ ফড়িং’ নামে এক ধরনের পোকা ধানের অনেক ক্ষতি করেছে। কিন্তু এ বছরযেন ধানে পোকা না লাগে সেজন্য শুরু থেকেই কৃষক সমাবেশ করে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

রাজশাহী জেলার তানোরে প্রতি বছরের মতো এবারও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে ধান কাটা-মাড়াইয়ের জন্য শ্রমিক আসতে শুরু করেছেন। এসব শ্রমিক ও স্থানীয় আদিবাসী নারী-পুরুষরা মিলে ধান কাটা-মাড়াই নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

তানোর উপজেলায় চলতি বছর কৃষকরা স্বর্ণা জাতের ধানের চাষ বেশি করেছেন। এদের মধ্যে রয়েছে সুমন স্বর্ণা, গুটি স্বর্ণা ও সাদা স্বর্ণা। কৃষকরা জানিয়েছেন, বিঘাপ্রতি ১৮ থেকে ২০ মণ করে ফলন হচ্ছে এসব জাতের ধান। যা গত বছরের তুলনায় বিঘাপ্রতি ৫ মণ করে ফলন বেশি হচ্ছে। এদিকে উপজেলার সব হাটে কেনাবেচার জন্য উঠতে শুরু করেছে নতুন ধান। বিক্রি হচ্ছে মণ প্রতি ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকা দরে।  কৃষকরা বলছেন, চলতি বাজারদর বজায় থাকলে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে লাভ হবে।

তানোর উপজেলার চিমনা গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান জনান, গত বছরের তুলনায় এ বছর ধানের ফলন ভালো হচ্ছে। ধানের দামও ভালো রয়েছে।

কৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, গত ২৪ অক্টোবর থেকে আমার প্রজেক্টে ধান কাটা-মাড়াই শুরু করেছি। গতবছরের চেয়ে এ বছর ধানের ফলন বেশি হচ্ছে। মোহনপুরের ঘাসিগ্রাম, বেলনা, গোছাহাট, আথরায়, শ্যামপুর, বিদিরপুর, চক আলম, মরমইল, আমরাইল, শিবপুর, কুঠিবাড়ি, মেলান্দি, বাদেজুল, বিষহারাসহ অনেকস্থানে রোপা আমন চাষ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে এসব অঞ্চলে শুরু হয়েছে ধান কাটা-মাড়াইয়ের উৎসব।

তানোর উপজেলার গোছা গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান জানান, চলতি মৌসুমে তিনি প্রায় ১২ বিঘা জমিতে আমন ধানের চাষ করেছেন। প্রতিটি জমিতে ধানের উৎপাদন ভালো হয়েছে। আশা করছি বিঘাপ্রতি জমিতে প্রায় ২০ মণ হারে ধানের ফলন হবে। বাজারে ধানের দামও ভালো রয়েছে। এছাড়াও গো-খাদ্য এবং পান বরজে ব্যবহারের জন্য আউড়ের (খড়) খুব ভালো দাম থাকায় ভালো লাভ হবে বলে আশা করছেন তিনি।

রাজশাহীর মোহনপুরের মৌগাছি গ্রামের কৃষক আশরাফুল ইসলাম জানান, তার এলাকায় আগাম রোপনকৃত জমির ধান কাটা শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, অন্যবার পোকার আক্রমণ বেশি থাকলেও এবারে নেই। পোকার আক্রমণ না থাকা ও আবহাওয়া অনুকূল থাকায় এবার ফলন ভালো হয়েছে। তার মত অনেক কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে।

পবা উপজেলার তেঘর গ্রামের আলতাব সরকার জানান, যে পরিমাণ ফলন হয়েছে শুরুতে যদি বাজারে ধানের দাম ভাল থাকে তাহলে কৃষকরা লাভবান হবে।

বাগসারা গ্রামের হাকিম বলেন, পরিমিত বৃষ্টিপাতের কারণে ধানে এবারে সেচ লাগেনি। সেচ না লাগায় গতবার ও এবারে বেশি জমিতে আবাদ হয়েছে। তবে ধানের ভালো দাম পেলে আরও কৃষক ধানচাষে ঝুঁকবেন বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন তারা।

পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা একেএম মনজুরে মাওলা জানান, বিগত কয়েক বছর থেকেই কম সেচের আবাদে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারিভাবেই বীজ, সার ও টাকা দেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত তার উপজেলায় এবারও প্রকৃতি অনুকূলে আছে। বাদামী গাছ ফড়িং থেকে খেত রক্ষায় আলোক ফাঁদসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সবমিলিয়ে আবাদ ভাল হয়েছে।

/বিটি/