জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার মাত্রাই ইউনিয়নে যৌন নির্যাতনের শিকার সেই স্কুলছাত্রীর অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার আগারগাঁও এলাকার নিউরো সার্জারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রবিবার বেলা সাড়ে ৩টায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখনও ফেরেনি তার জ্ঞান। মেয়েটির এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে তাদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার কথা জানা যায়। প্রত্যেকেই এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
এদিকে ঘটনার পর ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মেয়েটির চাচা বাদী হয়ে শনিবার কালাই থানায় মামলা দায়ের করলেও পুলিশ এ পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। পুলিশ ধারণা করছে ঘটনার সঙ্গে ওই পরিবারের অথবা গ্রামের কারও যোগসূত্র রয়েছে। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানায় পুলিশ। এক্ষেত্রে মেয়েটির জবানবন্দিই সব জট খুলে দিতে পারে বলে পুলিশের দাবি।
রবিবার সকাল ৮টায় মেয়েটির গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গোটা গ্রামের মানুষ মেয়েটির ওই ঘটনার জন্য আফসোস করছেন এবং ব্যক্ত করছেন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া। কারা ঘটালেন কেন ঘটালেন কেউ কিছুই বলতে পারছেন না কেউ। মেয়েটি স্থানীয় একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে পড়ালেখার প্রতি মেয়েটি আগ্রহ বেশি ছিল। স্কুল খুললেই তার দশম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার কথা। ক্লাসে তার নেতৃত্বেই অন্য ছেলে-মেয়েরা চলাফেরা করে। স্কুলেও মেয়েটি ভীষণ জনপ্রিয়। স্কুল থেকে তাদের বাড়ি প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে হলেও যাওয়া আসার পথে বখাটেদের উত্ত্যক্ত করার কোনও ঘটনার কথাও কেউ বলতে পারেনি।
স্থানীয়রা জানান, তাদের বাড়িটি ছিল খুব সুরক্ষিত। পুরো বাড়ি ইটের প্রাচীরে ঘেরা। বারান্দায় গ্রিল দিয়ে ঘেরা ছিল। তার বাবা ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘটনার দিন বারান্দা এবং দুই ঘরের দরজা খোলা ছিল তাই দুর্বৃত্তরা প্রাচীর টপকে খুব সহজেই মেয়েটির ঘরে প্রবেশ করতে পেরেছিল।
ঘর এবং বারান্দা ভেতর থেকে কেন বন্ধ করা হয়নি এমন প্রশ্নে মেয়েটির বাবা জানান, তারা সচরাচর দরজা খুলে রেখেই ঘুমিয়ে পড়েন। কোনও দিন সমস্যা হয়নি।
তার স্কুলের সহকারী শিক্ষক ওই গ্রামের রকিবুল বারি জানান, নির্যাতনের শিকার মেয়েটি তাদের স্কুলে খুব ভালো ও মেধাবী হিসেবে পরিচিত ছিল। স্কুলে একবার প্রবেশ করলে সে কখনও শ্রেণিকক্ষ থেকে বাহির হতো না। সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও পড়তো। তিনি এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
ঢাকায় মেয়েটির সঙ্গে থাকা তার ফুপার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলে জানা গেছে, আগারগাঁও নিউরোসার্জারি হাসপাতালে শনিবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে মেয়েটিকে ভর্তি করা হয়েছে। রবিবার বিকেল সাড়ে ৩টায়ও তার জ্ঞান ফেরেনি। চিকিৎসকরা চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি মেয়েটির জন্য সকলের দোয়া প্রার্থনা করেন।
স্থানীয় মাত্রাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আ ন ম শওকত হাবিব তালুকদার লজিক বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, নির্যাতিত মেয়েটির বাবা খুব সহজ সরল মানুষ। কারও সঙ্গে তার কোনও বিবাদ নেই। তিনি বলেন, ওই গ্রাম থেকে সামান্য দূরে গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জের রাজাবিরাট এলাকা। ওই এলাকার মাদকসেবীদের আড্ডা বেশি। যে নারকীয় ঘটনা ঘটেছে, তাতে মনে হয় কোনও সুস্থ মানুষ এ ধরনের অমানবিক কাজ করতে পারে না। তিনি এর বিচার দাবি করেন।
জয়পুরহাট সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) অশোক কুমার পাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার পর থেকে পুলিশ বিষয়টি নিয়ে তৎপর রয়েছে। নির্যাতিত মেয়েটির জ্ঞান ফিরলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি তদন্ত করছি। আশা রাখি খুব শিগগিরই এটি উদঘাটন করা সম্ভব হবে।
প্রসঙ্গত, শুক্রবার (২৪ ডিসেম্বর) দিবাগত রাত দু’টার দিকে প্রাচীর টপকে নবম শ্রেণির ওই ছাত্রীকে নির্যাতন করে তার মাথার বিভিন্ন স্থানে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। রাত ৪টার দিকে তাকে জ্ঞানহীন অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে বগুড়া ও পরে ঢাকার নিউরোসার্জারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় শনিবার মেয়েটির চাচা বাদী হয়ে কালাই থানায় ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে অজ্ঞাতদের আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন।
/এইচকে/