পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির দোয়েঞ্জায় আইইডি বিস্ফোরণে নিহত চার বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর সদস্যের বাড়িতে এখন শোকের মাতম। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তাদের পারিবার সদস্যরা দিশেহারা। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:
চাঁপাইনবাবগঞ্জ: মালিতে নিহত বাংলাদেশি সেনা সদস্য জামাল উদ্দিনের মা ছেলের লাশ দ্রুত দেশে ফেরত আনার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন,‘আমি এখন শুধু ছেলের মুখটা দেখতে চাই।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার ঘোড়াপাখিয়া ইউনিয়নের ধুমিহায়াতপুর ঘাইসা পাড়ার গ্রামে সৈনিক জামালের বাড়ি।
বৃহস্পতিবার সরেজমিন ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, কান্নায় ভেঙে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা। বাবার মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ জামালের সাড়ে পাঁচ বছরের ছেলে শিমুল। নিহত জামালের মা ফেরদৌসী খাতুন ছেলেকে হারিয়ে বুকফাটা আর্তনাদ করছেন। স্বামীকে হারিয়ে জ্ঞানহীন অবস্থায় বিছানা নিয়েছেন জামালের স্ত্রী শিল্পী খাতুন। জামালের একমাত্র ছেলে কখনও দাদুর কোলে, কখনো দাদির কোলে, কখনও বা বিছানায় পড়ে থাকা মায়ের পাশে বসে ছল ছল চোখে তাকিয়ে আছে। ছেলে হারানো পরিবারটিকে সান্ত্বনা জানাতে আসছেন এলাকার লোকজনসহ স্বজনরা।
বুধবার রাত ১১টায় জামালের মৃত্যুর খবর তার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। এই খবরে শোকে ভারি হয়ে উঠে পুরো এলাকা। জামাল পরিবারের সঙ্গে ফোনে শেষ কথা বলেছেন গত সোমবার। জামাল মালিতে সাড়ে ৯ মাস ধরে আছেন। তিন মাস পরেই তার দেশে ফেরার কথা ছিল।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে জামাল ছিলেন সবার বড়।
পিরোজপুর: মালিতে নিহত সেনাবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার আবুল কালাম আজাদের স্ত্রী ও সন্তানদেরকে এখনো কিছু জানানো হয়নি। শুধু কালাম দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এ ভাবেই কথাগুলো বলেন,‘নিহত কালামের চাচাতো ভাই ড. ফিরোজ কিবরিয়া।’
নিহত ওয়ারেন্ট অফিসার আবুল কালামের বাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার কলারদোয়ানিয়া ইউনিয়নের উত্তর কলারদোনিয়া গ্রামে।
ফিরোজ কিবরিয়া আরও বলেন,‘গত রাতেই আমরা জানতে পারি মালিতে কালামসহ চার বাংলাদেশি নিহত হয়েছে। এরপর থেকে কালামের বাড়ির ডিশ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। তার স্ত্রীর কাছ থেকে মোবাইল ফোনও সরিয়ে রাখা হয়েছে।’
তিনি জানান, কালামের বাবা-মা অনেক আগেই মারা গেছেন। বাড়িতে তার স্ত্রী সন্তান ও ষাটোর্ধ শারীরিক প্রতিবন্ধী এক বোন আছেন। কালামের স্ত্রী খাদিজা বেগম স্থানীয় মুগারজোর বালিকা দাখিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষিকা। মেয়ে আসনিকা আজাদ ইমু মুগারজোর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ে এবং ছেলে ফারদিন আজাদ বৈঠকাটা মাতৃছায়া কিন্ডার গার্টেনে চতুর্থ শেণিতে পড়ে।
পাবনা: পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির দোয়েঞ্জায় মাইন বিস্ফোরণে নিহত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীর বাংলাদেশি সেনা সদস্য মোহাম্মদ রায়হানের বাড়িতে চলছে আহাজারি। পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার কাশিনাথপুরের সোমাসনারী গ্রামে সৈনিক রায়হানের বাড়িতে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন পরিবারের সদস্যরা। তাদের সান্ত্বনা জানাতে আসছেন এলাকার লোকজনসহ স্বজনরা।
বৃহস্পতিবার ভোরে রায়হানের মৃত্যুর সংবাদ তার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। এই খবরে শোকে ভারি হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। তার পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নিহত রায়হানের দুই কন্যা সন্তান রয়েছে। বড় মেয়ের বয়স আট ও ছোট মেয়ের বয়স দুই বছর।এদিকে দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে রায়হান ছিলেন সবার বড়। রায়হানের মামাতো ভাই নান্নু ও আল আতিক হাসান এ তথ্য জানিয়েছেন।
আল আতিক হাসান বলেন, ‘বুধবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) বাবার সঙ্গে রায়হান শেষ কথা বলেন। ভোরে তার মৃত্যুর খবর আসে। রায়হান ১৫-১৬ মাস দরে মালিতে অবস্থান করছে। ১-২ মাস পরেই তার দেশে ফিরে আসার কথা ছিল।’
মাগুরা: মালিতে দায়িত্বরত অবস্থায় বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী মিশনের নিহত ল্যান্স কর্পোরাল আক্তার হোসেনের বাড়ি চলছে শোকের মাতম। মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় আক্তার হোসেনের স্ত্রী রেনু বার বার কান্নায় ভেঙে পড়েন।
মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার নাকোল ইউনিয়নের বরালিদহ গ্রামে।
তিনি জানান, ২৬ ফেব্রুয়ারি তার সঙ্গে শেষবারের মত মোবাইল ফোনে কথা হয়। বৃহস্পতিবার সকালে সেনাবাহিনীর একজন অফিসার তাকে মোবাইল ফোনে তার স্বামীর মৃত্যুর খবর দেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির আকাল মৃত্যুতে তার পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
তিনি জানান, আক্তার হোসেন ২১ বছর আগে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সর্বশেষ টাঙ্গাইলের ঘাটাইল নাইন ফিল্ড ব্যাটেলিয়ন থেকে ১০ মাস আগে শান্তিরক্ষী মিশনে যান। তাদের দুটি মেয়ে রয়েছে। বড় মেয়ে রিমি খাতুন এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে আর ছোট মেয়ে জান্নাতুল মাওয়ার বয়স সাত বছর।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত আক্তার হোসেনের ব্যাপারে সরকারিভাবে কোনও তথ্য জেলা প্রশাসন কিম্বা শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে আসেনি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
উল্লেখ্য,সৈন্যরা মালির মোপটি প্রদেশের বোনি ও দোয়েঞ্জা শহরের মধ্যবর্তী একটি সড়কে টহল দিচ্ছিলেন। এ সময় হঠাৎ আইইডি বিস্ফোরিত হলে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে।
বুধবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার দিকে উত্তর মালিতে এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন, পিরোজপুর জেলার বাসিন্দা ওয়ারেন্ট অফিসার আবুল কালাম (৩৭ এডি রেজি. আর্টি.), মাগুড়ার ল্যান্স কর্পোরাল আকতার (৯ ফিল্ড রেজি. আর্টি.), পাবনা জেলার সৈনিক রায়হান (৩২ ইবি) ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সৈনিক জামাল (৩২ ইবি)।
আহতরা হলেন নঁওগা জেলার বাসিন্দা করপোরাল রাসেল (৩২ ইবি), রাজবাড়ীর সৈনিক আকরাম (৩২ ইবি), যশোরের সৈনিক নিউটন (১৭ বীর) ও কুড়িগ্রাম জেলার সৈনিক রাশেদ (৩২ ইবি)।
আরও পড়ুন: ‘কুমিল্লা কারাগারে বন্দিদের অধিকাংশ মাদক মামলার আসামি’