নদীতে শ্যালো মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন, ভূমি ধসের শঙ্কা

নদীতে শ্যালে বসিয়ে বালু তোলা হচ্ছেজয়পুরহাটের ছোট যমুনা নদীতে শ্যালো মেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে বালু তুলে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে।  স্থানীয়দের অভিযোগ,জেলার ছোট যমুনা নদীর অন্তত ১০টি পয়েন্টে নদীর বুকে শ্যালো মেশিন বসিয়ে বোরিং করে বালু তুলে বিক্রি করছেন বালু ব্যবসায়ীরা। এসব বালু ব্যবসায়ীরা প্রভাবশালী হওয়ায় বাধা দিয়েও কোনও লাভ হয় না। বরং উল্টো হয়রানিতে পড়তে হয়।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে,এ বছর জেলার ১৪টি বালু মহালের মধ্যে ১৩টি ইজারা দেওয়া হয়েছে। একটি বালু মহালে বালু না থাকায় ইজারা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে নীতিমালা অনুযায়ী বালু মহালে ড্রেজিং করে নদীর তলদেশ থেকে বালু তোলা সম্পূর্ণ অবৈধ। এছাড়া ইজারার বাইরে জেলার সদর ও পাঁচবিবি এবং আক্কেলপুরের তুলশীগঙ্গা নদী থেকে অবাধে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।   

সরেজমিনে সদর উপজেলার দোয়ানী ঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, নদীর পৃথক চারটি স্থানে শ্যালো মেশিন দিয়ে তলদেশ থেকে বালু তোলা হচ্ছে। দোয়ানী ঘাটের পূর্ব পাশেও একই অবস্থা। অথচ মাত্র ২০০ গজ দূরেই বিশাল সেতু রয়েছে। অবাধে বালু তোলার জন্য সেতুটি হুমকিতে পড়বে বলে স্থানীয়রা মনে করছে।

তারা জানান, সংবাদকর্মীরা এসেছেন খবর পেয়ে মেশিন বন্ধ করে রেখেছে ব্যবসায়ীরা।

দক্ষিণ পাথুরিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, নদীর পূর্ব পাশে বাঁধ ঘেঁষে খাস জমিতে ড্রেজার মেশিন দিয়ে মাটি কেটে গভীর গর্ত করা হয়েছে।

নদীতে শ্যালে বসিয়ে বালু তোলা হচ্ছেওই গ্রামের মিনতি রাণী, তিলেশ্বরী ও শফিকুল ইসলাম বলেন,বাঁধ ও নদী থেকে মেশিন দিয়ে মাটি ও বালু তুলে বিক্রি করা হচ্ছে। এর সঙ্গে চেয়ারম্যান মেম্বার সবাই জড়িত। তারা বাধা দিতে গেলে হুমকি দেয়।

দোয়ানী-কুঠিবাড়ি বালু মহাল ইজারাদার আনিছুর রহমান বলেন, বালু মহালে বালু না থাকায় নদীতে দু’টি শ্যালো মেশিন বসিয়ে তিনি বালু তুলছেন। তাতেও তার পোশাচ্ছে না। অথচ তার বালু মহালের পূর্বদিকে ইজারা ছাড়াই শ্যালো মেশিন দিয়ে বালু তুলছেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকজন সদস্য।

তিনি বলেন,এই নদীর উত্তর জয়পুর,চকশ্যামসহ কয়েকস্থানে শ্যালো মেশিন দিয়ে অভৈধভাবে বালু তুলে বিক্রি করছেন প্রভাবশালী মহল। যার মধ্যে উত্তর জয়পুর এলাকায় বেলায়েত হোসেন বেনু নামের একজন বালু ব্যবসায়ী রয়েছেন।

শুকটিপাড়া-ছাওয়ালপাড়া বালু মহালের আলেক সাখিদার মিন্টু বলেন, ‘বৈধভাবে ইজারা নিয়ে তারা বালু ব্যবসা করলেও অনেকে ইজারা না নিয়ে নদী থেকে বালু তুলে বিক্রি করছেন। তাদের বাধা দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ তারা ক্ষমতাধর। কিছু বলতে গেলে আমাদের ক্ষতি হবে। ব্যবসার স্বার্থে আমাদের চুপ থাকতে হয়। উচ্চ মূল্যে বালু ঘাট ইজারা নিলেও ঘাটে বালু নেই। তাই বাধ্য হয়ে নদীর বুকে মেশিন বসিয়ে তারা বালু তুলছেন। তারপরও তাদের ইজারার টাকা উঠবে না।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জয়পুরহাট সদর উপজেলার চকশ্যাম এলাকার কয়েকজন কৃষক অভিযোগ করেন, দোগাছি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের নামে চকশ্যাম এলাকায় বিঘার পর বিঘা জমি থেকে বালু তুলে বিক্রি করা হচ্ছে। এমনকি নদীর পাশ থেকে বালু তোলার ফলে নদীর গতি পথও পরিবর্তন হয়ে হচ্ছে। চকশ্যাম এলাকার একটি সেতুও হুমকির মধ্যে পড়েছে। কারণ সেতু থেকে ৫০০ গজের মধ্যে বালু কাটার মহোৎসব চলছে।

কৃষি জমি থেকে মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছেজয়পুরহাট পূর্ব বাজারের ব্যবসায়ী মীর সাজ্জাদ পারভেজ বলেন,ওই এলাকায় তার তিন বিঘা জমির পাশেই এখন বালু তোলার কাজ চলছে। বাধা দিতে গেলে হুমকি আসে। জড়িতরা প্রভাবশালী হওয়ায় ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস করে না। পাশের জমির মাটি বা বালু কাটার ফলে প্রতিবছর তিনি মোটা অংকের টাকা খরচ করে জমির ভাঙন রোধ করছেন।

তবে অবৈধ বালু তোলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন দোগাছি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বালু ব্যবসার সঙ্গে আমি কখনও জড়িত ছিলাম না। এখনও নেই। তবে বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখবো।’

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানা বলেন, ‘ইতোপূর্বে মোবাইল কোর্ট ও মামলা করে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা হয়েছে। যদি অভিযোগ পাওয়া যায় দোষীদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’